২০২৬ সাল চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। গত ৫০ বছরে এই সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার ওপর ভিত্তি করে একটি সুসংহত কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিকে বাংলাদেশ এখন দেখছে অনেক বেশি সূক্ষ্ম, বাস্তবসম্মত এবং কৌশলগতভাবে পুনর্বিন্যাসকৃত এক প্রেক্ষাপট থেকে, বিশেষ করে এই অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির কারণে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে পথ চলেছে, যা স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। এই নীতি ঢাকাকে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তার ফলে বর্তমান প্রশাসন তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যার মূলমন্ত্র হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘আগে বাংলাদেশ’। এই পরিবর্তনের অর্থ ঐতিহাসিক মিত্রদের অস্বীকার করা নয়, বরং একটি বহুমুখী বিশ্বে জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চীনের পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিফলিত হয় দেশটির কিছু মূল নীতির মূল্যায়নের মাধ্যমে। বিশেষ করে সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অনাক্রমণ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সাম্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মতো পাঁচটি মূলনীতির কারণে চীন এমন এক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যারা রাজনৈতিক শর্তারোপের চেয়ে উন্নয়নে বেশি আগ্রহী। মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ার যে বৈশ্বিক দর্শনের কথা চীন বলে থাকে, তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই মিলে যায়। এই দেশগুলো চায় কোনো বিদেশি প্রভাব ছাড়াই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় নিজেদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সবচেয়ে দৃশ্যমান পদচিহ্ন দেখা যায় ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশ এই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত এবং শিল্প বিনিয়োগের মতো মেগা প্রকল্পগুলো থেকে বাংলাদেশ সরাসরি উপকৃত হচ্ছে। চীনের সহায়তায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সেতু ও মহাসড়ক বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে গতিশীল করেছে। ঢাকার কাছে এগুলো কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের বাহন।
তবে দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যে বড় ধরনের পরিবর্তনগুলো ঘটছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিকভাবে সচেতন এক তরুণ প্রজন্ম, যাদের ‘জেন-জি’ আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এমনকি বাংলাদেশেও তরুণদের এই আন্দোলন প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের দাবি তুলছে। এই তরুণরাই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথ এবং সেই সাথে পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার বদলে দিচ্ছে।
পরিবর্তিত এই পরিস্থিতি চীনকেও নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। তারা এখন স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশই বেইজিংয়ের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং বিআরআই প্রকল্পের অংশীদার। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল ভারত। সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই উদ্যোগ নিয়ে ভারতের কিছু আপত্তি রয়েছে। তা সত্ত্বেও চীন ও ভারতের সম্পর্ককে কেবল বিরোধের মোড়কে দেখা ভুল হবে।
সীমান্ত নিয়ে ঐতিহাসিক তিক্ততা থাকলেও ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে দেশ দুটি একে অপরের সাথে যুক্ত রয়েছে, যা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার এক বড় নিদর্শন। ভারতের সাথে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক নিবিড়তা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি উন্নয়নের জন্য চীনের পুঁজি, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত সহায়তার চাহিদাও অপরিসীম। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের প্রধান নীতি হলো কোনো নির্দিষ্ট একক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের এই কৌশলগত অবস্থানে তার ভৌগোলিক অবস্থান বড় ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের জন্য বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তাদের সক্রিয়তা এবং সমুদ্রপথে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে আঞ্চলিক ব্যবসা, লজিস্টিকস এবং বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ঋণের স্থায়িত্ব, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে যাতে উন্নয়ন টেকসই হয়। পাশাপাশি ঢাকাকে সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো বৈদেশিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে তার কৌশলগত স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে না যায়।
বৃহৎ অর্থনীতি, জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির কারণে ভারত এই অঞ্চলের কৌশলগত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশই জানে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য এই দুই শক্তির সাথেই তাদের সমান্তরালভাবে কাজ করতে হবে। এটি যেমন অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, তেমনি কিছু ঝুঁকিও তৈরি করে, যা অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ যদি তার স্বায়ত্তশাসিত পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে উন্নয়ন সহযোগিতার ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে, তবেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বলা যায়, এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাস্তবসম্মত উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। এটি কেবল আদর্শের পরিবর্তন নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে নেওয়া এক সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বহুমুখী বিশ্বের এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে চীনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগাতে হবে। একটি সমন্বিত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ।
লেখক: চীনের সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির (ECNU) একাডেমি অফ হিস্ট্রি অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন অফ সোশ্যালিজম-এর ভিজিটিং স্কলার।


