কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নকল সিগারেট তৈরির একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দ করা হলেও এজহারে কেবল তিন লাখ টাকার মাল জব্দের কথা উল্লেখ করে প্রশাসন। এতে অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত বুধবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের গড়বাড়িয়া গ্রামের হাবিব মাস্টারের গরুর খামারের ভেতরের একটি গোডাউনে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ। এ সময় পুলিশ ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোডাউন থেকে ডার্বি, নেভি ও রয়েল ব্র্যান্ডের প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেট এবং সিগারেট তৈরির বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয়। অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশও প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অভিযানের সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনেও বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট ও তৈরির সরঞ্জাম জব্দের তথ্য দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাতেই দায়ের করা মামলায় সেই জব্দের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। মামলার এজাহারে জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার শলাকা নকল সিগারেট ও ২৫ বস্তা তামাক, যার মোট মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে তিন লাখ টাকা।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর লিগ্যাল অফিসার কাজী মর্তুজা রেজা বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলাটি করেন।
এই বিশাল গরমিল ঘিরে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অভিযানে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট, তৈরির উপকরণ এবং প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি মেশিনের হিসাব মামলায় না থাকায় তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অভিযান পরিচালনাকারী প্রশাসন, পুলিশ এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও।
সুশীল সমাজের প্রশ্ন- দিনের অভিযানে যদি প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেটসহ প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দ হয়ে থাকে, তাহলে রাতের মামলায় সেগুলোর অধিকাংশের উল্লেখ নেই কেন?
আরও বড় প্রশ্ন-অভিযানে থাকা নকল সিগারেট তৈরির যে মেশিনটির মূল্যই প্রায় দুই কোটি টাকা সেটি কোথায় এবং কেন সেটি মামলার জব্দ তালিকায় নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের?
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মেশিনটি বর্তমানে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে অভিযানের সময় জব্দের কথা বলা ওই মেশিনসহ অন্য মালামাল প্রকৃতপক্ষে কী অবস্থায় আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর পুলিশ ও টোব্যাকো কোম্পানির প্রতিনিধিরা তড়িঘড়ি করে গোডাউন থেকে জব্দ না দেখিয়ে পাশের একটি বাড়ি থেকে কয়েক বস্তা মালামাল ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যান।
মামলার বিষয়ে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর প্রতিনিধিরা যে তথ্য দিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতেই জব্দ করা মালামাল ও এর মূল্য সম্পর্কে জানানো হয়েছিল।
মামলার বাদী কাজী মর্তুজা রেজার দাবি, গোডাউন থেকে যতটুকু মালামাল জব্দ করা হয়েছে, এজাহারে সেটিই উল্লেখ করা হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমান বলেন, বাদীপক্ষ এজাহারে জব্দ করা মালামালের যে বিবরণ দিয়েছে, সেটির ভিত্তিতেই মামলা নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দের তথ্য জানানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের জব্দের হিসাব এবং মামলার এজাহারের তথ্যের মধ্যে এত বড় পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো—তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় প্রধান আসামি করা হয়েছে গোডাউন মালিক হাবিব মাস্টারকে। মামলায় নাম উল্লেখ করে শাকিল আহম্মেদ, লোকমান হোসেন লিওন, সিদ্দিক মন্ডল, জিন্নাত, ইন্নাত, ফারুক ও তাষার ইমরানকে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার মতে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে নিম্নমানের তামাক ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নাম ও মোড়ক নকল করে সিগারেট তৈরি ও বাজারজাত করে আসছিলেন। অভিযানের সময় আসামিরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে চলতি বছরের ৯ মে র্যাব-১২ কুষ্টিয়া ও কাস্টমসের যৌথ অভিযানে একই স্থান থেকে পাঁচটি নকল সিগারেট তৈরির মেশিন ও প্রায় এক লাখ শলাকা নকল সিগারেট জব্দ করা হয়। পরে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল।
গোডাউনের মালিক হাবিব মাস্টার বলেন, জয়রামপুরের শাকিল ও বৈদ্যনাথতলার লিওন হোসেনকে মাসিক ৪০ হাজার টাকা ভাড়ায় গোডাউনটি দেওয়া হয়েছিল। এর আগেও র্যাব ও কাস্টমস অভিযান চালিয়ে গোডাউনটি সিলগালা করেছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরে আবার সেখানে কার্যক্রম শুরু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, সিলগালার কিছুদিন পরই আবার সেখানে নকল সিগারেট উৎপাদন শুরু হয়। ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত জব্দ তালিকা, জব্দ করা মালামালের পরিমাণ ও মূল্য প্রকাশ এবং এ ঘটনায় কারও গাফিলতি বা অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


