বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে সরকারি পুনর্বাসন কার্যক্রমে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এখনো সহায়তা পাননি।
চট্টগ্রাম অঞ্চল কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ জেলায় বন্যায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারি সহায়তা পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৭৪ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে প্রায় ৩১ জন সহায়তা পেয়েছেন। বাকি ৬৯ শতাংশ কৃষক এখনো সরকারি সহায়তার বাইরে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৮০ জন এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ২৬ হাজার ৬৩৪ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাঁচ জেলায় ফসলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৩০৯ কোটি ১৭ লাখ এবং তিন পার্বত্য জেলায় ৯২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জমির হিসাবেও ক্ষতির চিত্র উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৬১ হাজার ৪৮ হেক্টর ফসলি জমির মধ্যে ১৯ হাজার ২৪৯ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ৬৪ হাজার ২২২ হেক্টরের মধ্যে ২ হাজার ৩১৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৩ হাজার ৬২৩ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ১ হাজার ৪৩১ হেক্টর, ৩৩ হাজার ৪৭৩ হেক্টর আউশ আবাদে ১০ হাজার ৯১৫ হেক্টর এবং ২০ হাজার ৫৪৮ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ৫ হাজার ৪৪৯ হেক্টর আউশ আবাদে ৪৩৯ হেক্টর, ৫ হাজার ৪০৩ হেক্টর জুম আউশ আবাদে ২০৯ হেক্টর, ১ হাজার ৩৯৬ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ১৫০ হেক্টর এবং ৮ হাজার ১১২ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ১ হাজার ১১৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ধানের পাশাপাশি অর্থকরী ফসলেও বড় ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৫৬৪ হেক্টর আদা চাষের মধ্যে ৪০ হেক্টর, ৩৫৭ হেক্টর হলুদের মধ্যে ২৮ হেক্টর এবং ৩ হাজার ৪৮৪ হেক্টর পানের বরজের মধ্যে ২৪৪ হেক্টর নষ্ট হয়েছে।
পার্বত্য এলাকায় ৩৭ হাজার ৫০৬ হেক্টর ফল বাগানের মধ্যে ১৩৫ হেক্টর, ৩ হাজার ৩০৭ হেক্টর আদার মধ্যে ৮৫ হেক্টর, ২ হাজার ৩৬৪ হেক্টর হলুদের মধ্যে ৭২ হেক্টর, ৬৫০ হেক্টর পেঁপের মধ্যে ৪০ হেক্টর এবং অন্যান্য ৩৩ হেক্টরের মধ্যে ৮ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুম আউশ ও গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষিরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে এসব অর্থকরী ফসলের জন্য পৃথক পুনর্বাসন সহায়তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৮০ কৃষকের মধ্যে ৪৪ হাজার ৪৬৭ জন সরকারি বীজ ও চারা পেয়েছেন। সহায়তার হার ২৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় ২৬ হাজার ৮৩৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে সহায়তা পেয়েছেন ৯ হাজার ১৪৪ জন। সেখানে সহায়তার হার ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলেও ৬৬ শতাংশের বেশি কৃষক এখনো সরকারি সহায়তার বাইরে।
সরকারি পুনর্বাসনের আওতায় পাঁচ জেলায় ২৬৮ দশমিক ৭ টন উফশী রোপা আমন ধানের বীজ ৫৩ হাজার ৬১৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৫ দশমিক ১২ টন ধানের চারা উৎপাদন করে ৯৬০ জন কৃষকের কাছে দেওয়া হয়েছে। হাটহাজারী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, পটিয়া উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র এবং রাঙামাটির লংগদু ও নানিয়ারচর হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এক বিঘা জমির জন্য ৫ কেজি বীজ বা প্রয়োজনীয় চারা দেওয়া হচ্ছে। কয়েক বিঘা জমি হারানো কৃষকদের জন্য এ সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এখনো ১ লাখ ২২ হাজার ৪৪০ জন কৃষক কোনো সহায়তা পাননি।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘সহায়তার এই হার চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ৬৯ শতাংশ কৃষক সরকারি তালিকার বাইরে থাকায় আমন মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে আদা, হলুদ ও ফলের বাগান হারানো কৃষকরা আর্থিক প্রণোদনা বা ঋণ সহায়তা না পেলে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারেন।’


