বিএনপি সরকারের ছয় মাসের শাসনামলে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করাকে চিহ্নিত করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও বিরোধী দলের ওপর হামলাকে সরকারের ব্যর্থতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে দলটি।
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
জামায়াতের মূল্যায়নে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও গণভোটের রায় কার্যকর না করে সরকার কার্যত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন না করা শুধু সরকারের রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এর মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল প্রত্যাশাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গণভোটের রায় কার্যকর না করা সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এ অবস্থানে জাতি ও গোটা বিশ্ব বিস্মিত।’
জামায়াতের মূল্যায়নে অর্থনীতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের প্রবণতাকে সরকারের ছয় মাসের বড় ব্যর্থতার মধ্যে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের কথাও তুলে ধরেছে দলটি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। জামায়াতের দাবি, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া তবে জামায়াতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিযোগ দলীয়করণ নিয়ে। দলটির দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার বদলে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাই যেন যোগ্যতা হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের অভিযোগ তুলে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, এর ফলে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরছে না; বরং ছাত্ররাজনীতিতে সংঘাত বাড়ছে। একইভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ারও সমালোচনা করেছে দলটি।
পরওয়ার আরও বলেন, সরকারের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে না মেলা কর্মকর্তাদের ওএসডি, পদোন্নতি বঞ্চিত ও বদলি করা হচ্ছে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ আমলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। জামায়াতের ভাষায়, সরকার ফ্যাসিবাদী আমলের পথেই হাঁটছে।
সংসদীয় ব্যবস্থাপনায়ও সরকারের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে দলটি। গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দলের নির্বাচিত এমপিদের ওপর সরকারদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিরোধী এমপিদের সাংবিধানিক অধিকার ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে সরকারের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করলেও সেটির কৃতিত্ব সরকারকে দিতে নারাজ জামায়াত। গোলাম পরওয়ারের দাবি, মূলত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণেই রিজার্ভে স্থিতিশীলতা রয়েছে।
বিরোধী দল হিসেবে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বিষয়ে জামায়াত তুলনামূলক সংযত অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, তারা সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চান না। সংসদ ও রাজপথে জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি গঠনমূলক ভূমিকা রাখবেন। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথে না গিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করাই তাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের ছয় নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। নেতাকর্মীদের ওপর হামলার পরও সংঘাত এড়িয়ে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এমপি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম প্রমুখ।


