সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভাইরাল সংস্কৃতির যুগ তখনো আসেনি। কিন্তু চার দশক আগে মেক্সিকোর মাঠে হওয়া একটি ফুটবল ম্যাচ জন্ম দিয়েছিল এমন এক ইতিহাসের, যা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই দুটি ঐতিহাসিক গোলের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। চার দশক পার হলেও সিনেমা, নাটক, বই আর ডিজিটাল দুনিয়ায় আজও সমানভাবে জীবন্ত সেই মুহূর্ত, যা প্রমাণ করে এর আবেদন কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
১৯৮৬ সালের এই দিনে মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ফুটবলকে চিরদিনের জন্য বদলে দেন ম্যারাডোনা। প্রথম গোলটি তিনি করেছিলেন রেফারিকে ফাঁকি দিয়ে, নিজের বাম হাত দিয়ে বল পাঞ্চ করে। আর এর ঠিক পরেই দেখান পায়ের জাদু। মাঝমাঠ থেকে একাই বল টেনে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, তা পরে স্বীকৃতি পায় শতাব্দীর সেরা গোল বা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে।
এই চার মিনিটে ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা গত ৪০ বছর ধরে লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের বুদ করে রেখেছে। একে নিয়ে তৈরি হয়েছে বহু তথ্যচিত্র। ২০২১ সালের জীবনীভিত্তিক ড্রামা সিরিজ ‘ম্যারাডোনা: ব্লেসড ড্রিম’-এ এই লড়াইয়ের গল্পটি নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় রূপকথাকে চেনা রূপ দিয়েছে।
ম্যাচটির এমন চিরন্তন আবেগের পেছনে ছিল এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর এই ম্যাচটি মাঠে গড়ায়। ফলে ম্যাচটি আর্জেন্টাইনদের কাছে শুধু ফুটবল ছিল না, ছিল জাতীয় প্রতিশোধ ও প্রতিবাদের মঞ্চ। সেই বিতর্কিত গোলটি পরিচিতি পায় ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে, আর ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার এক জাতীয় লোকনায়ক।
আর্জেন্টিনার জন্য যা ছিল উৎসব, ইংল্যান্ডের কাছে তা হয়ে ওঠে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবিচার। ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ম্যারাডোনার প্রথম গোলটি ছিল এক চরম প্রতারণার প্রতীক। কয়েক দশক ধরে ব্রিটিশ গণমাধ্যম, টেলিভিশন শো ও কৌতুক নকশাতেও এই গোলটি নিয়ে ক্ষোভ ও রসিকতা চলেছে সমানতালে।
তবে সময় যত গড়িয়েছে, বিতর্ক ছাপিয়ে মানুষের মন কেড়েছে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটি। একাই পুরো প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্তটিকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ একক কৃতিত্ব বলা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ওই দ্বিতীয় গোলটির অনন্য শৈল্পিকতাই ম্যাচটিকে স্রেফ একটি বিতর্কিত লড়াই থেকে ইতিহাসের সেরা ম্যাচের মর্যাদায় বসিয়েছে।
‘হ্যান্ড অব গড’ শব্দগুচ্ছটি বিশ্ব সংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় উপাখ্যান। ফুটবলের খবর যারা রাখেন না, তারাও সিনেমা, গান বা দৈনন্দিন আড্ডায় এই শব্দের ব্যবহার বোঝেন। প্রতিভা, বিতর্ক আর কিংবদন্তির এমন মিশেল ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।
ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে এই ইতিহাসের আয়ু আরও বেড়েছে। প্রতি বছর ২২ জুন এলে ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স-এ (টুইটার) এই ম্যাচের ভিডিও ক্লিপ নতুন করে ভাইরাল হয়, শুরু হয় নতুন আলোচনা। যে প্রজন্ম ম্যারাডোনার খেলা সরাসরি দেখেনি, তারাও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে এই রোমাঞ্চের স্বাদ পাচ্ছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কোনো ক্রীড়া মুহূর্তের এমন পুনর্জন্ম সত্যিই বিরল।


