ভাষা সৈনিক আহমদ রফিককে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন সর্বস্তরের মানুষ। শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ।
অনেকে তাকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের এক আলোকবর্তিকা বলে বর্ণনা করেন। তারা বলেন, দেশের জন্য তার অবদান অনন্য, আগামী প্রজন্মকে সেই চেতনা ধারণ করতে হবে।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তার মরদেহ ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জীবদ্দশায় তিনি মরণোত্তর দেহ চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দান করার অঙ্গীকার করেছিলেন। তার নামে প্রতিষ্ঠিত রফিক ফাউন্ডেশন জানায়, কফিনটি শোকযাত্রার মাধ্যমে হাসপাতালে পৌঁছায়।
আহমদ রফিক ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষা সৈনিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক। তার লেখালেখি ও চিন্তা জাতীয় আন্দোলনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে তিনি সংগ্রামের অগ্রভাগে দাঁড়িয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতা, আলঝেইমার্স ও পারকিনসন্সসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর সাত মিনিট আগে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। শারীরিক অবস্থা অবনতির কারণে বুধবার বিকালে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। বারডেম হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান কানিজ ফাতেমার তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল।
কিডনির জটিলতার পাশাপাশি সম্প্রতি কয়েক দফা ‘মাইল্ড স্ট্রোক’-এ আক্রান্ত হন আহমদ রফিক। এর আগে, ১১ সেপ্টেম্বর ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাকে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন হাসপাতালের শয্যাতেই কাটে তার ৯৭তম জন্মদিন। গত এক মাসে দুইবার তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।
বার্ধক্য জনিত অসুখের পাশাপাশি ২০১৯ সাল থেকে তার দৃষ্টি ক্ষীণ হতে শুরু করে। ২০২৩ সাল থেকে তিনি প্রায় দৃষ্টিহীন ছিলেন। ২০২১ সালে পড়ে গিয়ে পা ভাঙার পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থা আরও অবনতির দিকে যায়।
১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে জন্ম নেন আহমদ রফিক। মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে। পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে।
ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন সরব কর্মী। ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী থাকাকালে মিছিল-সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালে আন্দোলনের কারণে একমাত্র তার নামেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
চিকিৎসক হিসেবে নয়, লেখক ও গবেষক হিসেবেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ শিল্প সংস্কৃতি জীবন। পরবর্তীতে কবিতা, প্রবন্ধ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও রবীন্দ্র-গবেষণাসহ শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন তিনি।
রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসেবে দুই বাংলায়ই তার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে তিনি পেয়েছেন ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি।
ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৬ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিলেন। তার কোনো সন্তান নেই। নিজের লেখা ও সংগ্রহ করা বইপত্রই ছিল তার একমাত্র সম্পদ।
মৃত্যুর আগে আহমদ রফিক নিজ দেহ ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে দান করে গেছেন।


