পৌর এলাকায় জমি রেজিস্ট্রিতে নতুন উৎসকর নীতির কারণে পিরোজপুরে জমি রেজিস্ট্রি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে জমির মূল্যের ওপর মাত্র ৪ শতাংশ রাজস্ব দিতে হতো, সেখানে গতবছর জুলাই থেকে চালু হওয়া নতুন নিয়মে প্রতি শতাংশ জমির জন্য নির্ধারিত ২৫ হাজার টাকা উৎসকর দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ জমি ক্রয়-বিক্রয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন, যার ফলে দিন দিন দলিল রেজিস্ট্রির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এক সময় পিরোজপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও, এখন সেখানে বিরাজ করছে নীরবতা। রেজিস্ট্রি কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকেরা অলস সময় পার করছেন। একই সাথে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ভূমি সংশ্লিষ্ট নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে জেলা সদর পৌরসভার প্রতি শতাংশ জমির জন্য ২৫ হাজার টাকা, উপজেলা পৌরসভার প্রতি শতাংশের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং ইউনিয়নে প্রতি শতাংশ জমির জন্য ৫ শত টাকা উৎসকর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এই নিয়ম চালুর আগে পৌরসভায় উৎসকর ছিল মাত্র ৪ শতাংশ এবং ইউনিয়নে ছিল মাত্র ২ শতাংশ। নতুন এই নিয়মে পৌরসভার ভেতরে রেজিস্ট্রির খরচ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
পিরোজপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফজলু শিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি নিজের চিকিৎসা ও ছেলের বিয়ের খরচের টাকার প্রয়োজনে দেড় বছর ধরে জমি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রেজিস্ট্রির খরচ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় কেউ জমি কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৌরসভার ভেতরে তার ১৫২ শতাংশ ধানি জমির বাজারমূল্য ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী সেই জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে শুধু উৎসকর ও অন্যান্য খরচ বাবদ লাগবে ৪৮ লাখ টাকা। এর ফলে জমির দামের চেয়ে রেজিস্ট্রির খরচ বেশি হওয়ায় কেউ জমি কিনতে চাচ্ছে না।
জমি বিক্রি করতে না পেরে বর্তমানে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন যাপন করছেন জানিয়ে উৎসকর কমিয়ে আগের নিয়ম ফিরিয়ে আনার দাবি জানান ফজলু শিকদার।
জমি কেনাবেচা কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন জমি রেজিস্ট্রেশন পেশার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা। পিরোজপুর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আব্দুল হামিদ জানান, নতুন উৎসকর নিয়ম চালু হওয়ার পর থেকে জমি কেনাবেচা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেখানে পিরোজপুর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০টি দলিল হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০০ থেকে দেড়শটিতে। আগে যেখানে প্রতিদিন একজন দলিল লেখক ৪ থেকে ৫টি দলিল লিখতেন, এখন সেখানে অনেক দলিল লেখকের সপ্তাহে একটি দলিলও লেখার সুযোগ হয় না।
তিনি বলেন, এর ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি এই পেশার সাথে জড়িত শত শত মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
সাধারণ মানুষ এবং এই পেশার সাথে জড়িত শত শত মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে সরকার দ্রুত এই নিয়ম পরিবর্তন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন আব্দুল হামিদ।
সার্বিক পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে পিরোজপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো: হুমায়ুন বিন সিরাজ বলেন, জমি রেজিস্ট্রিতে অতিরিক্ত উৎসকর নীতির কারণে সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অন্যদিকে দলিল রেজিস্ট্রির সংখ্যা ও সরকারের রাজস্ব আদায় অনেক কমে গেছে।


