এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালকে কেন্দ্র করে সেজেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাটকের মঞ্চ। বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের এই চূড়ান্ত লড়াই শুধু দুটি দেশের ট্রফি জয়ের যুদ্ধ নয়; এটি আসলে একটি বৃত্তপূরণের গল্প। এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়ের সমান্তরালে অন্য এক নতুন রূপকথার সূচনা।
একদিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাদুকর লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচের গৌরবময় সুর, অন্যদিকে সদ্য কৈশোর পেরোনো স্প্যানিশ বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামালের রাজকীয় উত্থানের জয়গান।
একজনের বিদায় আর আরেকজনের আগমন—যেন নিজের হাতেই এই ঐতিহাসিক ফাইনালের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ফুটবল দেবতা।
বিংশ শতাব্দীর সেই অদ্ভুত ছবি: যখন ইতিহাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের দেখা হয়েছিল
২০০৭ সালের এক হেমন্তের দিন। বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পের ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের জন্য ফটোশুট চলছিল। বিশ বছর বয়সী এক লাজুক তরুণ ফুটবলার প্লাস্টিকের টবে রাখা মাত্র কয়েক মাসের এক শিশুকে গোসল করাচ্ছিলেন। সেদিন কে জানত, ওই লাজুক তরুণ লিওনেল মেসি একদিন ফুটবল বিশ্ব শাসন করবেন, আর প্লাস্টিকের টবে হাসতে থাকা সেই ছোট্ট শিশু লামিন ইয়ামাল ১৯ বছর পর তারই মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের জার্সিতে!
লামিন ইয়ামালের সেই শিশু বয়সের ছবি আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা, মেসির হাত ধরে যে শিশুর ক্যামেরার সামনে আসা, সেই আজ মেসির রাজত্বে ভাগ বসাতে প্রস্তুত। ইয়ামাল নিজেই যেন মেসির ফেলে যাওয়া বার্সেলোনার সেই জাদুকরী ঐতিহ্যের মশালাবাহক।
লিওনেল মেসি: এক রূপকথার শেষ পাতা
আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে আসা সেই ছোটখাটো ছেলেটি, যিনি হরমোনজনিত সমস্যা কাটিয়ে ফুটবল বিশ্বে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, তিনি আজ সর্বকালের সেরা। ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে জাতীয় দল—মেসি যা ছুঁয়েছেন, তা-ই সোনা হয়েছে। বার্সেলোনার হয়ে রেকর্ডসংখ্যক ট্রফি ও ব্যালন ডি’অর জয়, এরপর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরা—মেসি ফুটবলকে দিয়েছেন পূর্ণতা।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফাইনালের পথ চলায় আবারও দেখা গেছে সেই চেনা মেসিকে। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছেন তিনি। তবে প্রতিটি ম্যাচের পরই যেন বেজে উঠছে বিদায়ের ঘণ্টা। এই ফাইনাল ম্যাচটিই হয়তো হতে যাচ্ছে ফুটবল আকাশে মেসির শেষ বিশ্বকাপ রাঙানোর মঞ্চ। আকাশি-সাদা জার্সিতে তার এই সম্ভাব্য শেষ নাচ দেখতে কোটি কোটি চোখ আজ অধীর অপেক্ষায়। বিদায়টা ট্রফি হাতে হোক কিংবা বিষাদে, মেসির অবদান ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।
লামিন ইয়ামাল: নতুন সূর্যের প্রদীপ্ত আলো
মেসি যখন ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে, ঠিক তখনই স্পেনের ফুটবলে উদয় হয়েছে এক নতুন সূর্যের, যার নাম লামিন ইয়ামাল। চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের ফাইনাল পর্যন্ত আসার পেছনে এই ১৯ বছর বয়সী তরুণের অবদান কোনো জাদুকরের চেয়ে কম নয়। উইং দিয়ে তার গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং আর গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দেখে ফুটবল বিশ্বের বোদ্ধারা বলছেন—তিনিই আগামী দিনের ফুটবল সম্রাট।
বার্সেলোনার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি থেকে উঠে এসে ক্লাব ফুটবলে ইতিমধ্যেই নিজের জাত চিনিয়েছেন ইয়ামাল। আর জাতীয় দলের জার্সিতে এই বিশ্বকাপে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা রূপকথাকেও হার মানায়। ইউরোর মঞ্চ কাঁপিয়ে এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির মুখোমুখি হওয়াটা ইয়ামালের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং একই সাথে পরম প্রাপ্তি।
ব্যাটন বদলের ফাইনাল
এই ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। একদিকে মেসি চাইবেন তার বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষটা বিশ্বকাপের আরও একটি সোনালী ট্রফি দিয়ে রাঙাতে, দেশের মানুষকে আরও একবার আনন্দের জোয়ারে ভাসাতে। অন্যদিকে, তরুণ ইয়ামাল চাইবেন লিজেন্ডের চোখের সামনেই নিজের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিতে।
খেলা মাঠে গড়াবে, ম্যাচ শেষের বাঁশির সাথে সাথে একদল হাসবে, অন্যদল কাঁদবে। তবে এই ম্যাচের আসল সৌন্দর্য এর ফলাফলের চেয়েও অনেক গভীরে। ফুটবল বিশ্ব আজ সাক্ষী হতে চলেছে এক কিংবদন্তির রাজকীয় বিদায় এবং এক নতুন নক্ষত্রের অভিষেকে ব্যাটন বদলের ঐতিহাসিক মুহূর্তের। মেসি থেকে ইয়ামাল—ফুটবলের এই বহমান ধারা চিরন্তন, আর সেই ধারা বয়ে নিয়ে চলার এক বড় মঞ্চ এই ফাইনাল।


