প্রতিদিন কেবল পাঁচ মিনিটের ব্যায়ামই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য বড় উপকার বয়ে আনতে পারে। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা সাইকেল চালানোর মতো শারীরিক কসরতে কেবল পাঁচ মিনিট ব্যয় করলেই তা হৃদস্বাস্থ্য, মস্তিষ্ক, স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেড় লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ওপর চালানো নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই আশাব্যঞ্জক তথ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকেই সকালে ব্যায়াম বা দৌড়াতে (জগিং) অনীহা বোধ করেন। তবু স্বাস্থ্য ভালো রাখার আশায় নিজের দেহকে অনেকটা জোর করেই শারীরিক চর্চায় নিয়োজিত করেন।
ব্যায়াম শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্ক, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত উপকারী। তবে নতুন গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে- সুস্থ থাকতে সব সময় কঠোর বা ভারী ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম- যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা প্রতি ১০টি অকাল মৃত্যুর মধ্যে অন্তত একটি প্রতিরোধ করতে পারে। এর মাধ্যমে লাখো মানুষ দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবন পেতে পারেন বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

তবে প্রতিদিন শুধু পাঁচ মিনিট ব্যায়াম করলেই যে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব বিষয়টি তাও নয়। বরং যারা একেবারেই নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করেন, তাদের জন্য এই সামান্য শারীরিক নড়াচড়াও স্বাস্থ্যের উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে যারা আগে থেকেই বেশ সক্রিয় বা ফিট, নিয়মিত ঘণ্টাব্যাপী ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট ব্যায়ামের প্রভাব তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইনেসিওলজির সহকারী অধ্যাপক নিকোল লগান বলেন, ‘শারীরিক পরিশ্রম মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত ক্লান্তি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। আমরা জানি, শারীরিক সক্ষমতা, পেশির শক্তি, পেশির গুণগত মান এবং হাড়ের দৃঢ়তা- এসবই দীর্ঘায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বেশি দিন বেঁচে থাকা এবং দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকা- দুই ক্ষেত্রেই ব্যায়ামের ভূমিকা রয়েছে।’
গবেষণার প্রধান লেখক এবং নরওয়ের ক্রীড়া বিদ্যালয়ের শারীরিক কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক উলফ একেলুন্ড বলেন, ‘প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিটের শারীরিক কার্যক্রম অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি এতটা কমাতে পারে- এটি সত্যিই বিস্ময়কর।’ তিনি জানান, এই ফলাফল কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং পুরো জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সামগ্রিক স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা জরুরি। তবে যারা জিমে যেতে পারেন না বা খেলাধুলার সুযোগ পান না, তাদের জন্যও দৈনন্দিন জীবনে একটু বেশি নড়াচড়া কিংবা কায়িক শ্রম যোগ করা উপকারী হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিদিন অলস বসে থাকার সময় মাত্র ৩০ মিনিট কমাতে পারলেও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৭ শতাংশ কমে যায়। কারণ শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ ও অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
উলফ একেলুন্ডের মতে, নিয়মানুবর্তিতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, ‘ধীরে শুরু করুন। এক ধাপে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করার চেয়ে ধীরে ধীরে সময় ও শরীর চর্চার ধরন বাড়ান। ব্যায়াম এমন হওয়া উচিত, যা ব্যক্তির পছন্দ ও সক্ষমতার সঙ্গে মানানসই।’
গবেষণাটি এমন আরও অনেক গবেষণার ফলাফলকে শক্তিশালী করেছে, যেখানে বলা হয়েছে- সুস্থ থাকতে জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই, বরং দৈনন্দিন জীবনে সামান্য পরিশ্রমও দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামও দীর্ঘায়ুতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে বলে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তি ষাট ও সত্তরের দশকে সাধারণ ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন করেছেন, তারা তুলনামূলক বেশি দিন বেঁচেছেন এবং তাদের মৃত্যুঝুঁকিও কম ছিল।
সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় ‘যখন তখন ব্যায়াম’ (এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং) নামে পরিচিত ছোট ছোট শারীরিক অনুশীলনের উপকারিতাও উঠে এসেছে। এ ধরনের অনুশীলনে সারাদিনে অল্প অল্প সময় ধরে শারীরিক কসরত করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এতে হৃদস্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং বয়স্কদের পেশির সহনশীলতাও বাড়ে। অংশগ্রহণকারীদের ৮২ শতাংশের বেশি নিয়মিত এই অভ্যাস চালিয়ে গেছেন, কারণ এটি সহজেই দৈনন্দিন রুটিনে যুক্ত করা যায়।
জিমে গিয়ে দীর্ঘ সময় টানা ব্যায়াম করার বদলে এসব ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’ স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যেই করা সম্ভব। যেমন ঘর পরিষ্কার করা, রান্নাঘরে গান শুনে নাচা বা সিঁড়ি দ্রুত ওঠানামা করাও হতে পারে কার্যকর অনুশীলন।
যুক্তরাজ্যের আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক মেরি মারফি বলেন, ‘ছোট ছোট অংশে ব্যায়াম করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বারবার সক্রিয় হয়। ব্যায়াম শেষ করার পরও শরীর কিছু সময় দ্রুত গতিতে কাজ করে। অর্থাৎ শরীরের বিপাকক্রিয়া তখনও সচল থাকে।’
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মানুষ যখন এক্সারসাইজ স্ন্যাকিংয়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন তারা এটি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে আগ্রহী হয়। এমনকি ছোট ছোট উৎসাহমূলক ও সচেতনতামূলক বার্তাও কার্যকর হতে পারে। যেমন সিঁড়ি ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়ে টাঙানো সাইনবোর্ড অনেক মানুষকে লিফট বা চলন্ত সিঁড়ির বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে।

যুক্তরাজ্যের লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক আমান্ডা ডেলি বলেন, ‘ছোট ছোট অভ্যাসই সময়ের সঙ্গে বড় পরিবর্তন গড়ে তোলে।’
তার ভাষায়, ‘আমরা অনেক কাজ অবচেতনভাবেই করি। যেমন সিঁড়ি ব্যবহার করা যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে সেটিই স্বাভাবিক আচরণ হয়ে দাঁড়ায়। অলস বসে থাকার অভ্যাস কমানোর সহজ উপায় হতে পারে গন্তব্য থেকে অন্তত পাঁচ মিনিট দূরে গাড়ি পার্ক করা।’
এতে সামান্য হাঁটাও শরীরকে সুস্থ রাখার দিকে একধাপ এগিয়ে নেবে। তিনি এই পদ্ধতিকে ‘স্ন্যাকিটিভিটি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়ামের তুলনায় এ ধরনের ছোট ছোট পরিশ্রম সহজে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগিয়েছেন।
ব্যায়ামের ধরন নিয়েও রয়েছে নানা বিকল্প। কেউ চাইলে পাহাড়ে চড়তে পারেন, নাচ শেখার ক্লাসে যোগ দিতে পারেন, কিংবা বিরতি নিয়ে নিয়ে সারাদিনই ব্যায়াম করতে পারেন। এসব ব্যায়াম রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ কমানো এবং শরীরের অতিরিক্ত চর্বি হ্রাসে কার্যকর।
অনেক সময় বাজারের ভারী ব্যাগ বহন করে হাতে ব্যথা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সামান্য কষ্টই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
তাই পরেরবার রান্না চুলায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কিংবা টেলিভিশন দেখার সময়ও কিছুক্ষণ স্কোয়াট (হাঁটু ভাঁজ করে বসে), পা ছোড়ার অনুশীলন বা বুকডন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ দিনের শেষে এই ছোট ছোট ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিংই’ শরীরকে আরও সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
সূত্র: বিবিসি


