আশিয়ান সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া এক নতুন আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। এক অভিনেত্রী তার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন। ওই অভিনেত্রীর অভিযোগ, নজরুলের দেওয়া “অনৈতিক প্রস্তাব” প্রত্যাখ্যান করায় তার ওপর হামলা চালানো হয়।
আবাসন খাতের এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ওঠা ধারাবাহিক নানা অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হলো এই নতুন অভিযোগ। এর আগেও তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি, জমি দখল এবং একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকার খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে ইমন নামের এক ব্যক্তি মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের বিষয়ে আলোচনার কথা বলে নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
স্নিগ্ধার অভিযোগ, নজরুলের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তারা আশিয়ান সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে খুঁজছে। যদিও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিনি যথারীতি অফিস করে যাচ্ছেন।
তবে নজরুল ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর কাছে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি উল্টো ওই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যে মামলা করার অভিযোগ তোলেন।
নজরুলের বিরুদ্ধে অতীতেও জমি দখল, হেনস্তা এবং হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও ভুক্তভোগীদের দাবি-তারা এখনো কোনো বিচার পাননি।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহরাব আল হোসেন জানান, স্নিগ্ধা কয়েকবার ফেসবুক লাইভে আসার পর থেকে নজরুল সতর্ক হয়ে গেছেন। তিনি জানান, আত্মগোপনে থাকা নজরুলকে গ্রেপ্তারে একাধিক পুলিশ টিম অভিযান চালাচ্ছে।
ওসি নিশ্চিত করেন, স্নিগ্ধার দায়ের করা মামলায় নজরুলই একমাত্র এজাহারনামীয় আসামি।
‘টাইমস’-এর কাছে স্নিগ্ধা জানান, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং বিষয়টি আপস করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে নজরুল এই দাবি অস্বীকার করে উল্টো স্নিগ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, স্নিগ্ধা মদ্যপ অবস্থায় তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে এসেছিলেন। সাক্ষাতের সময় স্নিগ্ধার মা-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
স্নিগ্ধা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাদের বাসায় অতিথি আসার কারণে তার মা আগেই চলে গিয়েছিলেন। সে সময় নজরুলের অফিসের পরিবেশ বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণই ছিল।
এ ছাড়া স্নিগ্ধা অভিযোগ করেন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা, যিনি একজন প্রতিমন্ত্রীও, নজরুলের “ক্ষমতার খুঁটি” হিসেবে কাজ করছেন। ওই রাজনীতিকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই নজরুল জামিন পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ওসি জানান, এ ধরনের কোনো জামিনের বিষয়ে তার জানা নেই।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান, একটি কমনওয়েলথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি শনিবার দেশে ফিরেছেন। এরপর রোববার ও সোমবার তিনি ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
অভিনেত্রী স্নিগ্ধার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
আমিনুল বলেন, “যদি সে (স্নিগ্ধা) সরাসরি কোথাও আমার নাম উল্লেখ করে থাকে, তবে আমি তা চ্যালেঞ্জ করব এবং মানহানির মামলা করব।” প্রতিমন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন , অন্য কেউ স্নিগ্ধাকে ইন্ধন দিয়ে এসব অভিযোগ করাচ্ছে।
নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝুলি
রাজধানীর দক্ষিণখান, উত্তরখান, খিলক্ষেত ও বরুয়া এলাকায় আশিয়ান সিটির বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জমি দখলের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
দক্ষিণখানের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন অভিযোগ করেন, ১৯৯৭ সালে কেনা তাদের জমি দখল করতে এবং পরিবারকে উচ্ছেদ করতে আশিয়ান সিটির ক্যাডাররা হুমকি দিয়েছে। কিন্তু দক্ষিণখান থানা তার অভিযোগ বা ডায়েরি নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
আরেক ভুক্তভোগী মনোয়ারা বেগম দাবি করেন, বিগত দুই দশকে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার ছত্রছায়ায় আশিয়ান সিটি প্রকল্পের জন্য শত শত মানুষের জমি দখল করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত মালিকরা কোনো আইনি প্রতিকার পাননি।
আশিয়ান সিটি সংলগ্ন ১২ কাঠা জমির মালিক এস এম সানাউল্লাহ অভিযোগ করেন, তার প্লটের বাউন্ডারি ওয়াল এবং ছয়টি খুঁটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত নকশা না মেনে এবং রাজউকের নির্দেশনা তোয়াক্কা না করেই অবকাঠামো নির্মাণ করে যাচ্ছে।
রাজউক জোন-২ এর কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান ‘টাইমস’কে জানান, উক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে তারা একের পর এক অভিযোগ পেয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, আশিয়ান সিটিকে অফিশিয়াল চিঠি ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বারবার সতর্ক করা হলেও তারা নির্দেশনা মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।
একটি সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ২৩টি হত্যা মামলায় নজরুলের নাম রয়েছে।
খিলক্ষেত থানার পরিদর্শক মো. সোহরাব আল হোসেন নিশ্চিত করেন, জমির বিরোধসহ নানা অভিযোগে নজরুল এবং আশিয়ান সিটির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে।
স্নিগ্ধা আরও দাবি করেন, ২০১৩ সালে ডিজিএফআই কর্পোরাল আবু তাহেরের ওপর হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় নজরুলের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে ‘টাইমস’ এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।


