এবারের বিশ্বকাপ আসরের আসল বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্র, বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনালে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন তিনি। তবে তার মতে, এই টুর্নামেন্টের প্রকৃত বিজয়ী শুধু কোনো দল নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রও।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, শুক্রবার নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফার এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আমরা একটি ফুটবলপ্রেমী দেশ। আমার মনে হয়, আমরা সেই অবস্থান ধরে রাখব। এই টুর্নামেন্ট সত্যিই পুরো বিশ্বকে একত্র করেছে।’

হোয়াইট হাউসের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ছিল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নানা ধরনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জের সমাপ্তি। কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যৌথ আয়োজক হিসেবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে নানা বাধা মোকাবিলা করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেওয়া কয়েকটি দেশের সমর্থকেরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা এবং টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়ে আয়োজকরা।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প এমন ইঙ্গিতও দেন যে, যেসব শহর ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করবে না, সেখান থেকে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। একই সময়ে যাতায়াত ব্যয় নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ফিফার মধ্যে মতবিরোধও দেখা দেয়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ভিসা নীতির কারণেও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। সোমালিয়ার এক প্রশংসিত রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
পরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরান দলের কিছু সমর্থক ও সহায়ক কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে ইরান দলকে সীমান্তের ওপারে মেক্সিকোর তিজুয়ানা শহরকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রের খাবার, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তা উপভোগ করার নানা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। বিয়ার থেকে শুরু করে র্যাঞ্চ ড্রেসিং, মার্কিন সংস্কৃতির নানা দিক আলোচনায় আসে।
টুর্নামেন্টের আগে যেসব আশঙ্কা ছিল, যেমন ম্যাচের আশপাশে অভিবাসনবিষয়ক অভিযান চালানো হতে পারে, সেগুলোর কোনোটি বাস্তবে ঘটেনি।
হোয়াইট হাউসের ফিফা টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেন, ‘আগেই আমরা বলেছিলাম, যদি আলোচনার মূল বিষয় হয় মাঠের খেলা, তাহলে বুঝতে হবে আমরা আমাদের কাজ ঠিকভাবে করেছি। কিন্তু বাস্তবে এটি আরও ভালো হয়েছে। এখন শুধু মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নয়, অসাধারণ সাংস্কৃতিক মুহূর্তগুলোও আলোচনায় এসেছে।’
তবে টুর্নামেন্ট চলাকালেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ম্যাচে মার্কিন তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য চলতি মাসের শুরুতে তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করেন।
লাল কার্ডের কারণে বেলজিয়ামের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচে বালোগুনের খেলার সুযোগ ছিল না। ট্রাম্পের দাবি, তিনি শুধু ইনফান্তিনোকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। পরে ফিফা সেই লাল কার্ড প্রত্যাহার করে।
শুক্রবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ইনফান্তিনোকে বলেন, ‘ভাবলে দেখবেন, এটিও ছিল আপনার আরেকটি ভালো সিদ্ধান্ত।’ তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়কে মাঠে রাখতে পেরেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত দলটি বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হারে।
অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেন, ভিডিও রিভিউ ও স্লো-মোশন রিপ্লে ব্যবহার করে লাল কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানো প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপকে শুধু নিরাপদ আয়োজন নয়, বরং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা হিসেবে নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না।
ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প দুই দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেন এবং তিন দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেন।
শুক্রবার কানাডার দাবানলের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর নিউ জার্সিতে বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কানাডার ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিও দেন ট্রাম্প।
এ সময় তিনি রসিকতা করে বলেন, ভবিষ্যতে আবার বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হলে ‘এবার মেক্সিকো ও কানাডাকে বাদ দেওয়া হোক।’
তবে এসব উত্তেজনার মধ্যেও ট্রাম্পের আমন্ত্রণে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে নিউ জার্সিতে যাচ্ছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
শেইনবাউম বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাই আমি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী কার্নিও সেখানে থাকবেন।’
স্বাগতিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ট্রাম্পই ফাইনাল শেষে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন।
তবে তিনি এখনো প্রকাশ্যে জানাননি, ফাইনালে স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা, কোন দলকে সমর্থন করছেন।
ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে অনীহা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি না দেওয়ায় দেশটি নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ রয়েছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। এমনকি দেশটির আইনসভা নির্বাচনে মিলেইর জোট জয়ী না হলে আর্জেন্টিনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ফাইনাল দেখতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ উপস্থিত থাকবেন। তবে কুসংস্কারের কথা উল্লেখ করে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই জানিয়েছেন, তিনি নিজ দেশে থেকেই ম্যাচটি দেখবেন।


