‘একটা অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার থেকে টানা ৩৮ দিন মিসিং মানে অনেক বড় একটা ব্যাপার। জানুয়ারি মাস অ্যাডমিশনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া, বার্ষিক স্পোর্টস, শিক্ষা সপ্তাহ এসব করতেই চলে যায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চও ছুটিতে যাচ্ছে। এপ্রিল-মে মাসে তো পরীক্ষার মৌসুম। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে লেখাপড়া শেখার সময় ও সুযোগটা তাহলে পেল কোথায়?’ বছরের প্রথমার্ধেই এত ছুটির কারণে শিক্ষার্থীদের পঠনপাঠন প্রক্রিয়ায় গোঁজামিলের সুযোগ তৈরি হলো বলে মনে করছেন রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর মামা আব্দুর রহিম খান।
পেশায় চিকিৎসক এই অভিভাবক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুধু পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষকরা তৎপর। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার ব্যাপারে তাদের দায়বদ্ধতার ঘাটতি আছে। শিক্ষকদের অতিরিক্ত ছুটির দাবির কারণেই এবার অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে সরকারকে। ফলে নিশ্চিতভাবেই শিখন ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’
হুট করেই অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে ছুটি বাড়ানোর সমালোচনা করেছেন শিক্ষাবিদরাও। তারা বলছেন, রমজান মাসে সবই তো চলছে- শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে কেন? রোজার বিষয়টি মাথায় রেখে স্কুলের সময় পরিবর্তন বা কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত করা যেতো। বিশ্বের কোথাও এরকম হয় না। আর পুরো রমজান মাস ছুটির জন্য শিক্ষকদের দাবিটি অন্যায্য। একটা অন্যায্য দাবি রক্ষা করার চেয়ে শিক্ষার স্বার্থ প্রধান্য দেওয়াটা সরকারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইতোপূর্বে পুরো রমজান মাস ছুটি থাকার ট্রেডিশন রয়েছে বলে জানান লক্ষীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরলক্ষী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ। তার মতে, শুরুতে পুরো রমজান মাস ছুটি রেখে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি করলে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির সম্ভাবনা থাকত না।
শামছুদ্দীন মাসুদ টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে যদি অতিরিক্ত এফোর্ট দিতে হয় বা অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয়, তা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে করা হবে। বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে।’
যে কারণে শিখনঘাটতির আশঙ্কা
শুক্রবার-শনিবারসহ ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত টানা ৩৮ দিন অবকাশ শুরু হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে এর প্রভাব কম পড়লেও, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন প্রক্রিয়ায় এর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ছুটি শেষে অন্যদের পরীক্ষার আগে অন্তত তিন মাস ক্লাস কার্যক্রমের সুযোগ থাকলেও প্রাথমিকের শিশুরা সময় পাবে মাত্র এক মাস।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অনুসারে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই প্রথম প্রান্তিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এর আগে, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে জানুয়ারি মাসজুড়ে ছিল ভর্তি প্রক্রিয়া, বার্ষিক ক্রীড়া এবং শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ততা। নির্বাচনী ডামাডোলে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধটাও চলে গেছে দেখতে দেখতে। এরপর শুরু হলো ছুটি। পরীক্ষার আগে এখন ক্লাস করার সুযোগ শুধু এপ্রিল মাসটাই।
মূলত, এবার ৮ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা ছিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর শুক্রবার-শনিবার ধরলে স্কুল বন্ধ হয় টানা ২১ দিন। তবে ১৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে এই ছুটি শুরু হবে। ফলে শুক্রবার-শনিবারসহ টানা ছুটি গিয়ে দাঁড়ায় ৩৮ দিনে। এই অতিরিক্ত ১৭ দিন ছুটির মধ্যে ৬ দিন শুক্রবার-শনিবার বাদ দিলেও- অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে ১১ দিনের ক্লাস-কার্যক্রমের ঘাটতি পড়ে যায়।
এ বিষয়ে রাজধানীর গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সমিতির সভাপতি মো. রিয়াজ পারভেজ বলেন, ‘অন্যান্যবার আগে থেকেই বার্ষিক ক্যালেন্ডারে পুরো রমজান মাসে ছুটি নির্ধারণ করা থাকত। তবে এবার অর্ধেক রমজান ছুটি রেখে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়েছিল। তবে এখন তো আবার পুরো রমজানই ছুটি ঘোষণা করলো। এক্ষেত্রে অল্প কয়েকদিনের শিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটা ঘাটতি হবে। তবে এই ঘাটতি আমাদের কাভার করে নিতে হবে।’
তবে পুরো রমজান ছুটি না দিলেও স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যেত এবং অভিভাকরাও বিরক্ত হতো বলে মনে করেন তিনি। রিয়াজ পারভেজ বলেন, ‘ছুটি না বাড়ালেও সেটা এক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতো। ছুটি বাড়ানোর কারণে অন্য ধরনের সমস্যা হয়েছে। এটা এক ধরনের উভয়সঙ্কট।’
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) শাহানা সারমিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যাতে স্টাডি গ্যাপে না পড়েন, তাদের যাতে শিখন প্রক্রিয়ার কোনো ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব।’
ছুটির পর চাপে পড়বেন শিক্ষার্থীরা
৩৮ দিনের দীর্ঘ ছুটির কারণে পরবর্তীতে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের ওপর পঠনপাঠন প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষার চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন অভিভাবকরা। তারা বলেছেন, ‘পরীক্ষা নেওয়ার জন্য হয়তো কোনোভাবে সিলেবাস শেষ করানো হবে কিন্তু পঠনপাঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।’
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর বাবা শেখ শাফায়াত হোসেন বলেন, ‘স্কুল খোলার কিছুদিন পরেই পরীক্ষা। এজন্য এই দীর্ঘ ছুটিতে মেয়েকে বাসায় পড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা করছি। নাহলে পরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে যাবে।’ পেশায় সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা এই অভিভাবক ইতোমধ্যে তার মেয়ের জন্য গাইডবই কেনার পরিকল্পনাও করেছেন বলেও জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদের অধ্যাপক মনিনুর রশীদ টাইমসকে বলেন, ‘আমরা কী জনতুষ্টি চাই, নাকি কারিকুলামের বাস্তবায়ন চাই-সেটা আগে নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষা কারিকুলাম, অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার- এসব হুট করে পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত যারা নেন, তারা শিক্ষাটাকে কীভাবে দেখেন- সেটা তারা বলতে পারবেন। সকাল বেলা ক্লাস বা হাফ-বেলা ক্লাস হতে পারতো। দুপুর পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালাতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। সারা বিশ্বেই তো ক্লাস চলে।’
গরমের দিন ক্লাস কখন কীভাবে হবে, বর্ষাকাল-শীতকাল-রোজার মাস হলে কী হবে- এসব বিষয়ে স্থায়ী নীতিমালা ঠিক করার পরামর্শ দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসরুমে লার্নিং উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত না করে উল্টো স্কুল বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয় বলেও মনে করেও এই শিক্ষাবিদ।
অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাণো খুব মুশকিল হয়ে যাবে বলে মনে করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘রমজানে লম্বা ছুটি দেওয়ার এই নিয়মটা পরিবর্তন হওয়া উচিত। তবে রমজান মাসে ক্লাসের সময়টা পরিবর্তন করা করা যেতে পারে। এমনিতেই শিক্ষাখাতের অবস্থা ভালো না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা কারিকুলাম, শিক্ষা ক্যালেন্ডার- এসব পরিবর্তনের ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান ছিলেন মনজুর আহমদ। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে গুরুত্বারোপের জন্য নতুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি তিনি। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পঠনপাঠনের কথা বিবেচনা করছেন না। তারা দাবি তুললো আর সরকার দিয়ে দিলো- সিদ্ধান্তটা ঠিক হয়নি। শিক্ষার স্বার্থটা দেখা উচিত আগে।’

