পাখিদের মধ্যে স্বমেহন বা নিজের যৌন উত্তেজনা নিজে প্রশমিত করার বিষয়টি একটি ‘স্বাভাবিক’ এবং স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোষা পাখির মালিকদের এই আচরণে বাধা দেওয়া বা পাখিকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে এই আচরণ খাঁচায় বন্দী থাকার চাপের কারণে হয় না। বরং এটি বন্য পরিবেশে থাকা পাখিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি গবেষক, পশুচিকিৎসক এবং পাখিপ্রেমীদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে পাখির মালিকদের পরামর্শ দেওয়া হতো পাখিরা এমন আচরণ করলে তাতে বাধা দিতে হবে। এমনকি অনেকে পাখিকে শাস্তিও দিতেন। তবে এই প্রতিবেদনের লেখকরা এখন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা সতর্ক করেছেন, পাখিদের বসার জায়গা সরিয়ে ফেলা থেকে শুরু করে হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মতো চরম পদক্ষেপগুলো পাখির এই আচরণের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের বিবর্তনীয় বাস্তুসংস্থানবিদ এবং এই গবেষণার অন্যতম সদস্য ক্লো হেইস বলেন, ‘এই ফলাফল নিশ্চিত করে যে খাঁচায় থাকার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাখিরা এটি করে না।’
হেইস আরও বলেন, ‘পাখিদের মধ্যে এটি অত্যন্ত বিস্তৃত একটি বিষয়। আমরা দেখেছি এটি তাদের যৌন আচরণেরই একটি অংশ এবং এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর।’
ঐতিহাসিকভাবে গবেষকরা মনে করতেন, পাখিরা কেবল খাঁচায় বন্দী থাকার মানসিক চাপ থেকেই এমনটা করে, অথবা তারা একেবারেই এটি করে না। এই ধারণা চ্যালেঞ্জ করতে গবেষক দলটি পাখির বিশেষজ্ঞ, প্রজননকারী এবং অনলাইন কমিউনিটিগুলোর ওপর জরিপ চালিয়েছেন এবং বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষক দলটি মোট ১২০টি প্রজাতির পাখির ওপর তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং বন্দী ও বন্য–উভয় পরিবেশে এই আচরণ লক্ষ্য করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে তোতাপাখি, টার্কি, হাঁস এবং মুরগিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে এই ‘এভিয়ান ওনানিজম’ বা পাখির স্বমেহন সাধারণ একটি বিষয়। পুরুষ পাখিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও স্ত্রী পাখিদের মধ্যেও এই আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
হেইস জানান, পুরুষ পাখিরা সাধারণত গাছের ডাল, খেলনা বা এমনকি মালিকের হাত বা কাঁধের সঙ্গে শরীর ঘষে। স্ত্রী পাখিরা লেজ উঁচু করে সুবিধাজনক বস্তুর ওপর বসে। এই সময় তারা বিশেষ ধরনের শব্দ করে এবং ডানা ঝাপটায়।
এই কাজটিকে স্বাভাবিক মনে না করে অনেক শখের পাখি পালনকারী পশুচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেন এই ভয়ে যে, তাদের পোষা পাখিটি হয়তো নিজের ক্ষতি করছে।
হেইস লক্ষ্য করেছেন, কিছু পশুচিকিৎসক পাখির শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় স্পর্শ না করতে বা খেলনা সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দিতেন। এমনকি কিছু চরম ক্ষেত্রে পাখিদের ড্রাগ থেরাপি বা যৌন ক্ষমতা নষ্ট করার জন্য অস্ত্রোপচার করা হতো, যাকে হেইস ‘পাগলামি’ বলে অভিহিত করেছেন।
গবেষণাটি বলছে, এই আচরণের ফলে যদি কোনো দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা না হয় (যা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে), তবে পশুচিকিৎসকদের উচিত নয় মালিকদের এটি বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী এবং গবেষণার সহলেখক মাতিল্ডা ব্রিন্ডল বলেন, ‘বন্য পরিবেশে এই আচরণের উচ্চহার প্রমাণ করে পাখিদের লালন-পালনের প্রথাগত পদ্ধতিতে তাদের শাস্তি দেওয়া বা চিকিৎসা করা ভুল ছিল।’
ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের পশুচিকিৎসক আনা বাস্টো এই গবেষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এটি পাখির আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা পেশাদারদের আরও সঠিক পরামর্শ দিতে সাহায্য করবে।’


