রোদ ঝলমলে বৃহস্পতিবার দিনের সকাল ১১টা। অবশ্য রোদেলা দিনের মুড বদলে যেতে সময় নিল না। আকাশ ফুঁড়ে নেমে এলো বৃষ্টি। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে সংবাদকর্মীরা মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের মিডিয়া প্লাজার লাউঞ্জে আশ্রয় নিলেও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অলরাউন্ডার রিজান হোসেনের তাতে থোড়াই কেয়ার। কিটব্যাগ আর লাগেজ নিয়ে নেমে এলেন একাডেমি ভবনের সামনে। কারণ দীর্ঘ দুটি সফর শেষ করে তখন বাড়ি ফেরার তাড়া এই তরুণ ক্রিকেটারের।
জিম্বাবুয়েতে কদিন আগেই ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতে এসেছেন ৬ ফুট ১ ইঞ্চির এই অলরাউন্ডার। ব্যাটে-বলে দারুণ এক টুর্নামেন্ট কেটেছে তার। ৭ ম্যাচে ১৮২ রান করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার, ডান হাতি পেসে উইকেট নিয়েছেন ১০টা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফাইনালে ৫ রানের জন্য মিস করেছেন প্রথম সেঞ্চুরি। তবে এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে করেছেন টানা দুই ফিফটি। এমন পারফর্ম্যান্সের পর চেহারাতেও তার তৃপ্তির ঝলক।
একে বাড়ি ফেরার তাড়া, ওদিকে গাড়িতে ওঠে সতীর্থরা অপেক্ষা করছেন তার জন্য। তবুও টাঙ্গাইল থেকে উঠে আসা দীর্ঘদেহী এই ক্রিকেটার সময় দিলেন মিনিট দশেক। একাডেমি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ‘দ্য ডেইলি টাইমস অফ বাংলাদেশ’-এর জুবায়ের তানিনকে শোনালেন নিজের ক্রিকেট যাত্রার গল্প-
টাইমস: আপনার ক্রিকেটে আসার গল্পটা শুনতে চাই…
রিজান : ক্রিকেটটা শুরু আমার ছোটবেলায় ২০১৫ সালে টাঙ্গাইল থেকে। টাঙ্গাইলে আমি টেপ টেনিসে শুরু করেছি বড় ভাইদের সাথে। ওখান থেকে ক্রিকেট বলে আসা। টাঙ্গাইল স্পোর্টস একাডেমিতে শুরু। আমার আব্বু হচ্ছে ক্রিকেট অনেক ভালো বুঝেন। পার্সোনালি আমার কাছে কোচের মতোই লাগে। বলতে পারে আমার পার্সোনাল ট্রেনার।
টাইমস: অনেকের এমন অনেক গল্প থাকে, পেসার থেকে স্পিনার হয়ে গেছে, স্পিনার থেকে পেসার; আপনার এমন কিছু আছে নাকি?
রিজান : ছোটবেলায় এলাকায় যখন খেলতাম, আমাকে বড় ভাইয়েরা বলতো ‘তুই পেস বোলিং কর।’ আমি এমনিতে লম্বা আছি। আমি টেপ টেনিস বলে পেস বল করতাম, ভালো করতাম। যখন ক্রিকেট বলে আসলাম তখন টেপ টেনিসে ভালো বোলিং করা থেকে ক্রিকেট বলে পেস বোলিং শুরু করলাম।
টাইমস: আন্ডার নাইন্টিনের হয়ে প্রথম ম্যাচের স্মৃতি কিছু মনে পড়ে?
রিজান : আন্ডার নাইন্টিনের প্রথম ম্যাচ খেলেছি এই বছর ইউএইর সাথে, আমাদের হোমেই হয়েছিল। ওখানে আমি ভালো একটা ইনসুইং করে বোল্ড করেছিলাম। আর ইউএইর সাথে… কভারের ওপর দিয়ে খেলতে পছন্দ করি, কভার ড্রাইভ আমার ফেভারিট শট। কভারের ওপর দিয়ে একটা ছয় মেরেছিলাম, এই দুটা স্মৃতি অনেক মনে আছে।
টাইমস: আপনার প্লেইং রোলটা কিন্তু মডার্ন ক্রিকেটে এখন রেয়ার; পেস বোলিং অলরাউন্ডার। হার্দিক পান্ডিয়া, ক্যামেরন গ্রিন, বেন স্টোকস, মার্কো ইয়ানসেনরা ছাড়া খুব বেশি নাম পাবেন না। বাংলাদেশেও সাইফউদ্দিন ছাড়া কেউ নেই সেভাবে। এই চ্যালেঞ্জটা কেমন লাগে?
রিজান : চ্যালেঞ্জ অবশ্যই, পেস বোলিং অলরাউন্ডার হওয়া কষ্টকর আছে। এখানে পরিশ্রমটাও বেশি। কিন্তু আমাদের যে ট্রেনার আছে, রিচার্ড (স্টোনিয়ার) ওর কাজটা যদি আমি কন্টিনিউ করতে পারি, ওটা ধারাবাহিকভাবে করতে পারলে, একটু কষ্ট হলেও আমি এটা করতে পারব, আমি বিশ্বাস করি।
টাইমস: বেন স্টোকস আপনার প্রিয় অলরাউন্ডার জানি। চোখের সামনে সাকিব থাকার পরেও স্টোকস কেন? প্লেইং রোলের মিলের জন্য?
রিজান: বেন স্টোকস আমার ফেভারিট অলরাউন্ডার। তবে সাকিব ভাইকেও আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে না এমনটা না। সাকিব ভাইকে দেশের মধ্যে ভালো লাগে। যেহেতু আমি পেস বোলার, সাথে ব্যাটসম্যান। আমি জেনুইন ব্যাটার বাট বোলিং করি। কিন্তু স্টোকস তো পেস বোলিং অলরাউন্ডার, এজন্যই বেশি ভালো লাগে।
টাইমস: দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ আর ত্রিদেশীয় সিরিজের অভিজ্ঞতা কেমন? ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন সফলতা পাচ্ছেন? কেমন লাগে?
রিজান: ফিলিংসটা আলহামদুলিল্লাহ ভালো। সাউথ আফ্রিকাকে ওদের মাটিতে হারিয়েছি, দুটা ফিফটি আছে। ওই দুইটা ফিফটির জন্য দল জিততে পেরেছে, আর ফাইনালে তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো পারফরম্যান্স হয়েছে, এর জন্য ট্রাইনেশন চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি সবসময়ই অন্যরকম লাগে। এজন্য আরো বেশি ভালো লাগছে।
টাইমস: সামনের বছরের শুরুতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপটাও আপনাদের জিম্বাবুয়ে আর নামিবিয়া মিলিয়ে। সাম্প্রতিক এই অভিজ্ঞতাটা কীভাবে কাজে লাগাবেন? এখানে ভালো করে এসেছেন… বাংলাদেশের উইকেটের সাথে মিল আছে?
রিজান: বাংলাদেশের মতোই সিমিলার জিম্বাবুয়ের উইকেট। এখানের উইকেটে বাউন্স কম আছে, জিম্বাবুয়ের উইকেটেও বাউন্স কম আছে। আর ওখানে আমরা খেলে আসছি এটার এক্সপেরিয়েন্সটা কাজে লাগবে। সামনের বছর ওখানেই বিশ্বকাপ হবে। এই ভেন্যুতে ভালো প্রিপারেশন হলো আমাদের। আর সবখানেই তো ভালো করেছি। কোথাও তেমন নেগেটিভ রেজাল্ট আসেনি। জিম্বাবুয়েতে সামনের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে যা যা করা দরকার, সেভাবেই প্রিপারেশন নিচ্ছি। কোচরাও ভালোভাবে কাজ করছেন আমাদের সাথে। কন্সিস্ট্যান্সি থাকলে বিশ্বকাপে ভালো রেজাল্ট আসবে।
টাইমস: সামনের মাসে ইংল্যান্ড সফর আছে আপনাদের। ওখানকার কন্ডিশন-উইকেট তো আলাদা…
রিজান: আগামী মাসে ইংল্যান্ড ট্যুর আছে। ইংলিশ সামার শেষ হচ্ছে। কিছুদিন পর এ নিয়ে ক্যাম্প শুরু হবে। ক্যাম্পের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কী ওয়েদার, উইকেট কেমুন, ওইরকম প্রিপারেশনের প্র্যাকটিস আমরা করব। যেহেতু আগে খেলিনি ওখানে।
টাইমস: ব্যাট করেন চারে পাঁচে, দলের সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ পজিশন। পরিস্থিতি অনুযায়ী স্পিনার-পেসারদের খেলতে হয়। বোলারদের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেন?
রিজান: হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই। প্র্যাকটিসে দুই-তিনটা নেট থাকে। একটা নেটে নতুন বল থাকে, একটা নেটে সেমি নিউ বল থাকে, আরেকটা নেটে পুরনো বল থাকে। ওই নেটে শেষ করে সাইড নেটে আসি। সাইড নেটে ব্যাটিং শেষ করে আবার নকিংয়ের জন্য আলাদা বল থাকে। আলাদা সবকিছু থাকে। কতগুলো বল নতুন থাকে, কতগুলো বল পুরনো থাকে। সব মিক্স করে আপনারা প্র্যাকটিস করি।

টাইমস: আপনার উচ্চতা বেশ ভালো। বেশিরভাগ ম্যাচেই পুরনো বলেই বল করেন। উচ্চতার কারণে এক্সট্রা বাউন্সও পান। কোচ ডলার মাহমুদের সাথে আলাদা করে কিছু নিয়ে কাজ করছেন?
রিজান: আমি বেশিরভাগ ম্যাচেই মিডল ওভারে বল করি। এখানে ডলার স্যার আমাকে বেশ ভালোভাবে হেল্প করছেন। পুরনো বলে কীভাবে সুইং করাতে হয়, রিভার্স সুইং করাতে হয়, এর জন্য যা টিপস লাগে সবই দিচ্ছেন। সাথে বলটা কীভাবে মেন্টেইন করতে হয়, উনি সবকিছুই শেখাচ্ছেন। বল কীভাবে ধরলে সুইং করবে, রিভার্স করবে উনি এটা শেখাচ্ছেন। ওটার জন্য অনেক ভালো হেল্প হচ্ছে।
টাইমস: শ্রীলংকাতেও একটা সেঞ্চুরি মিস করেছিলেন, এবারও তাই। সেঞ্চুরি মিস করে মাঠ ছাড়তে বেশি হতাশ লাগে?
রিজান: সেঞ্চুরি মিস করলে বেশি আক্ষেপ লাগে। ডাক আউট হয়ে গেলে তো আউট হয়েই গেলেন। কিন্তু সেট হয়ে সেঞ্চুরি মিস করলে আক্ষেপটা বেশি লাগে।
টাইমস: খাবাদাবারের মেন্যুতে তো বদলে এসেছে নিশ্চিত। এতদিন পর বাড়ি যাচ্ছেন, গিয়ে প্রথম কোন খাবারটা খাবেন?
রিজান: হ্যাঁ, ফুড হ্যাবিটে তো বেশ চেঞ্জ এসেছে। কিন্তু আমার ফেভারিট হচ্ছে গরুর মাংস আর পোলাও। খেলার বাইরে থাকলে খাই। কিন্তু আমি বাসায় গেলেই আম্মু এটা রান্না করে। খেলার বাইরে থাকলে বাড়ি গেলে আমি এটা এক বেলা হলেও খাই। এটা আমার পছন্দের।
টাইমস: এলাকায় নামডাক কেমন? বন্ধুরা এবার নিশ্চয়ই একটু অন্যভাবে ওয়েলকাম জানাবে? যেহেতু চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন…
রিজান: মনে হয় একটু আলাদাভাবে দেখবে (হাসি)। কিন্তু আমি তো তাদের কাছে ফ্রেন্ড হিসেবেই থাকব। দেখা যাক কী হয়, যেয়ে দেখি।
টাইমস: অবসরে কী করেন? অনেকেই আছেন যারা ক্রিকেটের পরিসংখ্যান ঘাটেন। আপনার অভ্যাস আছে?
রিজান: অবসরে বই পড়ি, সিনেমা দেখি, নাটক দেখি। আর স্ট্যাট আসলে চেক করা হয় না। আমি সময় পেলে নাটক-সিনেমাই দেখি।


