মিয়ানমারের জান্তা প্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট পদে আরোহণের দুই মাসে না হতেই প্রতিবেশী ভারতে সফর করছেন মিন অং হ্লাইং। সামরিক জান্তার প্রধান থেকে বেসামরিক দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তার প্রথম বিদেশ সফর।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শনিবার শুরু হওয়া পাঁচ দিনের সরকারি সফরে সাবেক এই জেনারেল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিক সরকার প্রধানঅং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন হ্লাইং। এরপর থেকেই দেশটির সামরিক নেতৃত্বকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক প্রতিবেশীই এতোদিন এড়িয়ে চলেছিল।
কাজেই পাঁচ বছর পর মিয়ামনারের কোনও শীর্ষ নেতার এই বিদেশ সফর, মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশীদের আঞ্চলিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, ভারতের জন্য এই সফর মিয়ানমারে চীনের অতিরিক্ত প্রভাব কমানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে ভারত মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা খনিজ মজুদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে চাইছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মিয়ানমার উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেসামরিক পোশাকে আসার পর মিন অং হ্লাইং পুরো অঞ্চলে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চাইছেন। আসিয়ানের সঙ্গেও তিনি আরও স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রত্যাশা করছেন।’
হর্সির মতে, থাইল্যান্ড ও আসিয়ানের আরও কিছু সদস্য দেশের সমর্থন নিয়ে তিনি এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান।
পাশপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে মিন অং হ্লাইং শিগগির বেইজিং সফর করতে পারেন বলে জানান হর্সি। বলেন, ‘চীন যেমন মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বন্ধু, ভারতও তাদের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। স্বাভাবিকভাবেই গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে।’
‘মিন অং হ্লাইং প্রায় নিশ্চিতভাবেই আরাকান আর্মি ও চিন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তা চাইবেন’, যোগ করেন তিনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হ্লাইংয়ের সফরে মিয়ানমার ও ভারতের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনায় আসবে।’
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেন মিন অং হ্লাইং। এর পর থেকে দেশটিতে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। তার নেতৃত্বাধীন সেনা অভ্যুত্থানও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়ে।
আসিয়ান জোটের সদস্য হয়েও মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের সম্মেলন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে অন্য দেশগুলো। এতে হ্লাইংয়ের প্রশাসন ক্রমে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তবে গত বছরের ভয়াবহ ভূমিকম্প মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি সুযোগ তৈরি করে। এরপরই তিনি ব্যাংককে আসিয়ানের আঞ্চলিক সম্মেলনে বিরল সফর করেন।
ঘোষণা দেন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের। তবে সেই নির্বাচন ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে ব্যাপক সমালোচিত হলেও জান্তা সরকার প্রধান থেকে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন হ্লাইং।
মিয়ানমারে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘নির্বাচনের পর তিনি ক্রমেই আরও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা চাইছেন।’
দীর্ঘদিন ধরে বেইজিংয়ের সমর্থন ও বিনিয়োগ পেলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভারতকে বেছে নেওয়ার পেছনে মিয়ানমারকে চীনের গভীর প্রভাব থেকে হ্লাইং কিছুটা সরিয়ে আনতে চাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গৌতম বলেন, ‘ভারত ও চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক সামলানোর পদ্ধতির অংশ এটি। তারা চাইছে চীনের কাছে তুলনামূলক বেশি নতি স্বীকার করা এবং ভারতের সঙ্গে একই সময়ে সেই সম্পর্কে কিছুটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা।’
ভারতও মিয়ানমারের সম্পদে প্রবেশের পথ খুঁজতে আগ্রহী। একটি শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর (আরাকান আর্মি) সহায়তায় তারা খনিজ নমুনা সংগ্রহের চেষ্টাও চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে রয়টার্স।
গৌতমের ভাষায়, ‘ভারতের দিক থেকে এই সফরের মূলে আছে- কাঁচামাল, বিরল মৃত্তিকা খনিজ এবং ব্যবসায়িক প্রস্তাবের দিক থেকে তারা কী পেতে পারে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীও ঠিক সেটিই চায়, কারণ তারা নিজেদের সামরিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে চায়।’


