শঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে জাপানের জনসংখ্যা। শুক্রবার প্রকাশিত দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ হারিয়েছে জাপান। এ তথ্য দেশটির ক্রমবর্ধমান জনমিতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, প্রাথমিক আদমশুমারির ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে জাপানের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৩০ লাখে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৬১ লাখ।
১৯২০ সালে দেশটির আদমশুমারির তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা হ্রাস বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
দ্রুত কমছে জনসংখ্যা
২০০৮ সালে জাপানের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৭০ সালের মধ্যে তা কমে ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে আসবে। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৯৮৯ সালের সমপর্যায়ে ফিরে গেছে।
বহু বছর ধরে জাপান সরকার তরুণদের বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করে আসছে, যাতে দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
এতে বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে জাপান। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি একটি জন্মের বিপরীতে ঘটছে দুটি মৃত্যু।
জনসংখ্যা হ্রাসের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে অন্য উন্নত দেশেও দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরইমধ্যে জনসংখ্যা হ্রাসের প্রভাব জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পড়ছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাপ বাড়ছে এবং শ্রমিক সংকটও তীব্র হচ্ছে।
সংকট ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় পুরো দেশে
সবশেষ আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, জাপানের প্রায় সব অঞ্চলে জনসংখ্যা সংকট পৌঁছে গেছে। দেশের ৪৭টি প্রিফেকচারের মধ্যে মাত্র দুটি ছাড়া বাকি সবগুলোতেই ২০২৫ সালে জনসংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা হ্রাসের গতি আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের আকিতা ও আওমোরি প্রিফেকচার। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এসব অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় আট শতাংশ কমেছে। সেখানে জাপানের সবচেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষের বসবাস। অন্যদিকে কম মজুরি ও কঠোর শীতের কারণে তরুণরা দ্রুত এসব এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চল
কর্মসংস্থানের খোঁজে তরুণরা টোকিও, ওসাকা, নাগোয়া ও অন্য বড় শহরে চলে যাওয়ায় জাপানের গ্রামাঞ্চল ক্রমেই জনশূন্য হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়কে বৃদ্ধাশ্রম ও কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করা হচ্ছে। লাখ লাখ বাড়ি খালি পড়ে আছে। সরকারি অফিস ও হাসপাতালগুলো আকার ছোট করছে এবং অনেক রেলপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশিদের জন্য জাপানের দরজা আরও উন্মুক্ত করা হলে জনসংখ্যা হ্রাসের কিছুটা প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। তবে দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘জাপান ফার্স্ট’ নীতির সমর্থক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের প্রভাবও বেড়েছে।
জাপান বিষয়ে গবেষণা করা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপক জেমস রেমো বলেন, ‘জাপান এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে স্বল্প বা মধ্যম মেয়াদে এই জনসংখ্যা হ্রাস আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ব্যাপক অভিবাসন ছাড়া এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।’
কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে
আদমশুমারিতে কিছু ইতিবাচক তথ্যও পাওয়া গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের উপক্রান্তীয় দ্বীপপুঞ্জ ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা সামান্য বেড়েছে। জাপানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জন্মহারও এই অঞ্চলে। সেখানে একজন নারী গড়ে ১ দশমিক ৫টি সন্তানের জন্ম দেন, যেখানে জাতীয় গড় ১ দশমিক ১।
অন্যদিকে বড় শহরগুলো আপাতত জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। টোকিও ও আশপাশের কানাগাওয়া, সাইতামা এবং চিবা প্রিফেকচার নিয়ে গঠিত বৃহত্তর টোকিও অঞ্চলের জনসংখ্যা ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে তিন কোটি ৭০ লাখে পৌঁছেছে। বর্তমানে জাপানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এই অঞ্চলে বাস করে।
ব্যবসা, রাজনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্র টোকিও বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। ২০২৫ সালে শহরটির জনসংখ্যা এক শতাংশের বেশি বেড়ে এক কোটি ৪২ লাখে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থানের খোঁজে শিক্ষার্থী ও তরুণ কর্মীদের আগমনের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকগুলোতে জাপানের পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পুলিশ বিভাগ ও রেলস্টেশনে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে কর প্রদানকারী তরুণের সংখ্যাও কমে যেতে পারে।
অধ্যাপক জেমস রেমোর ভাষায়, জন্মহার বাড়াতে জাপান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ‘উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন’ আনতে পারেনি। তবে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের জন্য জাপান গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এশিয়াসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশ আগামী দিনে একই ধরনের জনসংখ্যাগত সংকটের মুখোমুখি হবে। জাপান শুধু এই প্রবণতার অগ্রভাগে রয়েছে এবং অন্যদের তুলনায় অনেক আগে থেকেই এর অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।’


