বিশ্ববিনোদনের জগতে এক নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছে শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর। স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্স আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, তারা ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির ফিল্ম ও স্ট্রিমিং ব্যবসাকে অধিগ্রহণ করতে চলেছে। প্রায় ৮২.৭ বিলিয়ন ডলারের (ঋণসহ মোট কোম্পানির মূল্য) এই বিশাল চুক্তি বিশ্বব্যাপী বিনোদন শিল্পকে আমূল পরিবর্তন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নগদ অর্থ ও স্টকের সমন্বয়ে এই চুক্তির ইক্যুইটি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
ঐতিহ্য এবং স্ট্রিমিংয়ের মেলবন্ধন
এই অধিগ্রহণের ফলে নেটফ্লিক্স কেবল ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ফিল্ম ও টিভি স্টুডিওগুলিই পাচ্ছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাদের গেমিং ব্যবসা, এইচবিও এবং এইচবিও ম্যাক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলিও। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের তীব্র প্রতিযোগিতার পর কমকাস্ট এবং ডেভিড এলিসনের প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সকে পেছনে ফেলে নেটফ্লিক্স চূড়ান্ত বিডার হিসেবে জয়ী হল।
এই চুক্তির ফলে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের শতবর্ষের ঐতিহ্য এবং বিশ্বমানের গল্পের ভান্ডার এখন নেটফ্লিক্সের পোর্টফোলিওতে যুক্ত হবে। নেটফ্লিক্সের বিদ্যমান জনপ্রিয় সিরিজ যেমন ‘স্ট্র্যাঞ্জার থিংস’ এবং ‘স্কুইড গেইম’ -এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের বহু জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি, যার মধ্যে রয়েছে—‘গেইম অব থ্রোনস’, ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’, ডিসি ইউনিভার্সের কনটেন্ট, হ্যারি পটার, এবং ক্লাসিক সিনেমা ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ ও ‘সিটিজেন কেইন’।
চুক্তি প্রসঙ্গে নেটফ্লিক্সের সহ-নির্বাহী প্রধান টেড সারানডস বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সব সময় ছিল বিশ্বকে বিনোদন দেওয়া। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের অবিশ্বাস্য লাইব্রেরি যুক্ত হওয়ার ফলে আমরা আরও ভালোভাবে সেই কাজ করতে সক্ষম হব।’
ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রধান নির্বাহী ডেভিড জ্যাসলাভ এই দিনটিকে ‘দুই সেরা গল্প বলার কোম্পানির মিলন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
লেনদেনের শর্তাবলী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ওয়ার্নাস ব্রাদার্সের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ধরা হয়েছে ২৭.৭৫ ডলার। মোট কোম্পানির মূল্যের মধ্যে ঋণও অন্তর্ভুক্ত। এই লেনদেনটি উভয় সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়েছে।
নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, তারা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের বর্তমান কার্যক্রম বজায় রাখবে এবং চলচ্চিত্রের থিয়েটার রিলিজের মতো শক্তিগুলোর ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে। স্বল্পমেয়াদে, এইচবিও ম্যাক্স একটি স্বতন্ত্র পরিষেবা হিসেবে থাকবে বলে নেটফ্লিক্স ইঙ্গিত দিয়েছে। নেটফ্লিক্সের অনুমান, এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার তৃতীয় বছরের মধ্যে তারা বছরে ২ বিলিয়ন থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ সাশ্রয় করতে পারবে।
এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার আগে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে তার গ্লোবাল টিভি নেটওয়ার্কস বিভাগ, ডিসকভারি গ্লোবাল নামে একটি নতুন পাবলিক কোম্পানিতে বিভক্ত করতে হবে, যা ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। নেটফ্লিক্সের সাথে চুক্তিটি এরপরে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা ও উদ্বেগ
যদিও নেটফ্লিক্স এই চুক্তিকে একটি ‘শক্তিশালী বিনোদন শিল্প’ তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, তবে এই অধিগ্রহণের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রবল বিতর্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে নেটফ্লিক্সের এই পদক্ষেপ স্ট্রিমিং জগতে একচেটিয়া ক্ষমতা সৃষ্টি করবে। রিপাবলিকান প্রতিনিধি ড্যারেল ইসা এই চুক্তির বিষয়ে অ্যান্টিট্রাস্ট উদ্বেগ উত্থাপন করেছেন, কারণ নেটফ্লিক্স বর্তমানে ৩০০ মিলিয়নের বেশি গ্রাহক নিয়ে ‘অতুলনীয় বাজার ক্ষমতা’ রাখে।
রাইটার্স গিল্ড অব আমেরিকা এবং অন্যান্য শিল্প গোষ্ঠী এই একীভূতকরণ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই চুক্তি কর্মীদের জন্য চাকরি হ্রাস, মজুরি হ্রাস, কর্মপরিবেশের অবনতি, গ্রাহকদের জন্য উচ্চ মূল্য এবং কনটেন্টের বৈচিত্র্য কমিয়ে দেবে।
সিনেমা ইউনাইটেডের প্রধান নির্বাহী মাইকেল ও’লিয়ারি বলেছেন, এই একত্রীকরণ বিশ্বজুড়ে সিনেমা ব্যবসার জন্য ‘অভূতপূর্ব হুমকি’ তৈরি করতে পারে। তাদের ভয়, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের বড় বাজেটের সিনেমাগুলো ভবিষ্যতে হলে মুক্তি না পেয়ে সরাসরি স্ট্রিমিংয়ে চলে যেতে পারে।
নেটফ্লিক্সের সহ-প্রধান নির্বাহী টেড সারানডস আত্মবিশ্বাসী এই অধিগ্রহণ সৃজনশীল কর্মীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করবে।
নেটফ্লিক্স যদি এই চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের ওয়ার্নাস ব্রাদার্স ডিসকভারিকে ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের ব্রেকআপ ফি দিতে হতে পারে।
[বিবিসি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে]


