শত শত প্রাণহানি ও হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার দুই বছর পরও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রক্তপাতের দায় নিতে রাজি নয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। দলটির নেতা-কর্মী ও কট্টর সমর্থকেরা এখনো ঘটনাটিকে “ষড়যন্ত্র” হিসেবেই দেখানোর চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, আওয়ামী লীগ অনুশোচনার বদলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ান বজায় রাখা, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা ও দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টাতেই ব্যস্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে কোনো দলেরই ভুল স্বীকার করা বা ক্ষমা চাওয়ার ইতিহাস নেই। আওয়ামী লীগও সেই পথেই হাঁটছে। কিন্তু এই অবস্থান দলটিকে মূলধারার রাজনীতি থেকে কেবল দূরেই ঠেলে দিচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা এবং অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভ্যুত্থানকালীন হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করে। ইতিমধ্যে এক মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেও বিচার চলছে।
বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। দেশে থাকা তৃণমূল কর্মীরা গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও চরম আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
এত বড় রাজনৈতিক সংকটেও আওয়ামী লীগের মধ্যে আত্মসমালোচনা, ক্ষমা চাওয়া বা প্রাণহানির দায় নেওয়ার কোনো লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। কী কারণে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হলো, তাও পর্যালোচনা করেনি দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, বাংলাদেশে ভুল না মানার সংস্কৃতি রয়েছে। দল আধুনিক ও চিন্তায় পরিপক্ব না হলে ভুল স্বীকার করতে চায় না। আওয়ামী লীগও সেই চেষ্টা করছে না।
তিনি টাইমস’কে বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ কখনো ভুল স্বীকার করেননি। ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য জামায়াত ক্ষমা চায়নি। বিএনপিও ক্ষমতায় থাকতে ভুল স্বীকার করতে চায়নি।’
আওয়ামী লীগ কেন দায় স্বীকার করছে না?
বিশ্লেষকেরা জানান, প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করলে দলের অতীত অবস্থান ও নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই ক্ষমা চাওয়ার চেয়ে আগের অবস্থানে অনড় থাকাই বেছে নেন নেতারা।
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ক্ষমা চাইলে দেশের মানুষ সাধারণত ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ তা করেনি, হয়তো করবেও না। কারণ ক্ষমা চাইলে তাদের রাজনীতির ভিত্তিই আর থাকে না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায় এলে হত্যার পেছনে যুক্তি খাড়া করেছে আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে গণহত্যার কথা জাতিসংঘের রিপোর্টে উঠে এসেছে, মানুষও তা জানে। অথচ শেখ হাসিনার কথা শুনে মনে হয় কিছুই হয়নি।’
আওয়ামী লীগ কী বলছে?
ক্ষমতাচ্যুত দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিমের কথাতেও অনুশোচনার লক্ষ্মণ নেই।
তিনি টাইমস’কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভুল করলে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে দ্বিধা করত না। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ভুল করেননি, তবে তিনি কেন ক্ষমা চাইবেন?’
বর্তমানে ভারতে থাকা নাছিম গণঅভ্যুত্থানকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল। এখানে শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া হয়। তাই গণহত্যার পরও অনুশোচনা আশা করা অমূলক।
দলটি কি রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কি রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘পতনের কারণ বিশ্লেষণ ও আত্মসমালোচনা না করা পর্যন্ত রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই বললেই চলে। বর্তমান নেতৃত্বের সেই ক্ষমতা আছে বলে আমি মনে করি না।’
দিলারা চৌধুরী জানান, ভারতে থেকে শেখ হাসিনার বারবার রাজনীতিতে ফেরার বক্তব্য মুলত কর্মী চাঙ্গা রাখার কৌশল। তবে তৃণমূলের অনেকেই এখন আর সেই আশ্বাসে বিশ্বাস করছেন না।
অভ্যুত্থানের সূত্রপাত কোথায়?
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই বিরোধী দল দমনের অভিযোগ ওঠে। পরে হাইকোর্টের রায় দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখে দলটি। তবে এসব নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরেও প্রশ্ন ছিল।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করায় প্রবীণ নেতারাও দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। জনগণের ক্ষোভ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ মিলেই শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটায়।’
তিনি বলেন, দলটি রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আওয়ামী সমর্থকদের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি
অভ্যুত্থান-পরবর্তী কিছু ঘটনা আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে আত্মরক্ষামূলক মনোভাব তৈরি করেছে। যেমন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় সমর্থকেরা উল্টো ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি তাদের।
আন্দোলনের পরপরই শাসন আমলের দুর্নীতি, গুম ও হত্যাকাণ্ডের কারণে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে অনুশোচনা জেগেছিল।
তবে তাদের বক্তব্য, আন্দোলন শেষে যখন সমর্থকেরা ঢালাও হামলা ও মামলার শিকার হতে শুরু করেন, তখন সেই অনুশোচনা বদলে আত্মরক্ষামূলক মনোভাব তৈরি হয়।


