বাংলাদেশে নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির আগেই সংসদের মেয়াদ পার হয়ে যাওয়া এখন নিয়মিত চিত্র। কখনো কখনো দেখা যায়, এক আদালতের রায়ে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হলেও আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই পাঁচ বছরের মেয়াদ পার করে ফেলেছেন সেই সংসদ সদস্য। নির্বাচনী বিরোধের প্রতিকার পেতে এই দীর্ঘ বিলম্ব পুরো আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করছে।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচন। পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ৩৩ হাজার ৩৭৭ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের সুধাংশু শেখর হালদারকে পরাজিত করেন। সুধাংশু শেখর নির্বাচনে অনিয়ম ও হলফনামায় ভুল তথ্যের অভিযোগ তুলে এই ফলাফলকে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে চ্যালেঞ্জ করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ সাঈদীর সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন সাঈদী। হাইকোর্টের সেই আদেশে স্থগিতাদেশ দেয় আপিল বিভাগ। ফলে সাঈদী তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে সক্ষম হন এবং মামলার প্রক্রিয়া চলাকালেই তিনি পূর্ণ মেয়াদ পার করেন।
নির্বাচনী পিটিশনগুলো বছরের পর বছর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে বেতন-ভাতা ভোগ করেন এবং আইন প্রণয়নে অংশ নেন। অন্যদিকে আদালতে দৌড়াদৌড়িতেই সময় পার করেন মামলার বাদী। দিনশেষে আর মামলা নিষ্পত্তি হয় না, তার আগেই সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরও আদালতে মামলার জোয়ার শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী বিভিন্ন আসনের ফলাফল নিয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ বা নির্বাচনী আইন অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত আদালতে অন্তত ৪৪টি আবেদন জমা পড়েছে।
আইনে নির্বাচনী মামলাগুলো সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা রয়েছে। বিচারকদের অপ্রয়োজনীয় মুলতবি এড়াতেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। আদালতে বিচারক সংকট এবং নানা আইনি মারপ্যাঁচে এই সময়সীমা মানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, আইনের বইয়ে দ্রুত বিচারের কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটে না। ট্রাইব্যুনাল বা বেঞ্চ পরিবর্তন হওয়ার কারণে মামলাগুলো বারবার পিছিয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হোসেন লিপু এই পরিস্থিতিকে ‘উপহাস’ বলে অভিহিত করেন।
দেশের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল আদালত কর্তৃক বাতিলের ইতিহাস খুবই কম। স্থানীয় নির্বাচনে এমনটা দেখা গেলেও জাতীয় পর্যায়ে এটি অত্যন্ত বিরল। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রায় ১৬ লাখ ভোট বাতিল হওয়ায় প্রার্থীরা নতুন আশা দেখছেন। তারা মনে করছেন ব্যালট পুনরায় গণনা করা হলে ফলাফলে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ টাইমস’কে জানান, প্রত্যেক প্রার্থীর আদালতে যাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে। তিনি মনে করেন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফলাফল পর্যালোচনার সুযোগ সব দেশেই থাকে। তবে আদালতের রায় আসলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির মেয়াদে করা কাজগুলো বাতিল হয় না।
আইনজীবী ফয়জুল্লাহ ফয়েজ ও সাইফুল ইসলাম সাইফ টাইমস’কে বলেন, আদালতের রায়ে কেউ পদ হারালেও তার আগের সংসদীয় কার্যক্রম বা আইন প্রণয়ন অবৈধ হয় না। ফলে একজন মামলাকারী শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেও সেই বিজয় কেবল প্রতীকী হয়েই থাকে।


