নির্বাচনের উত্তাপ যত ঘনীভূত হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি আর আচরণেও তত ফুটে উঠছে দ্বিমুখী ভাব। একদিকে শোনা যাচ্ছে নৈতিকতার আশ্বাস ও আদর্শিক উচ্চারণ, অন্যদিকে আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর ভাষার নির্লজ্জ চর্চা।
এই দ্বিচারিতার স্পষ্ট উদাহরণ সম্প্রতি উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামীর দুই ভিন্ন বক্তব্যে, যা নারীর সম্মান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দুটিকেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে গভীর প্রশ্নের মুখে।
সম্প্রতি বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, ‘নারীরা আমাদের মায়ের জাত; তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’
অন্যদিকে, একই দলের বরগুনা জেলা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান তার জনসভায় দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আগে ছিল ‘বেশ্যাখানা’।
একই রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে উচ্চারিত এই সম্পূর্ণ বিপরীত ভাষ্য কি কেবলই ব্যক্তিগত মতপার্থক্য? নাকি এটি উন্মোচন করছে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটকে?
এধরনের বক্তব্যকে ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করেন নারী অধিকারকর্মীরা।
বরগুনায় জামায়াত নেতার দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে নারী অধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘উই ক্যান’ এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের হেয় করা ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার শুধু রাজনৈতিক শালীনতার অবক্ষয় নয়; এটি নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষকে সামাজিকভাবে বৈধতা দেয়।’
তার মতে, সমাজে এমন মনোভাব আগে থেকেও ছিল, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও জনপরিসরে এর বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান প্রতিরোধ ছিল। এখন প্রকাশ্যে ও ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের বক্তব্য বাড়ছে। ফলে নারীর প্রতি অবমাননাকর এই ভাষা ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
জিনাত আরা হকের বিশ্লেষণে উঠে আসে নির্বাচনী রাজনীতির আরেকটি অস্বস্তিকর দিক।
তার ভাষায়, পুরুষ ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়তা পেতে কিংবা তাদের কাছে ‘মুখরোচক’ আলাপ তুলে দিতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমাজে বিদ্যমান নারীবিদ্বেষী মানসিকতাকে সচেতনভাবেই ব্যবহার করছে। শিক্ষিত, প্রশ্নকারী ও প্রতিবাদী নারীদের উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিনি এই প্রবণতাকে ওয়াজ মাহফিলে নারীদের নিয়ে রগরগে ও অবমাননাকর আলোচনার সঙ্গে তুলনা করেন। যার আদলে এখন ভোটের প্রচারেও নারীর জন্য অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। আর দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশই নারী।
এই বাস্তবতায় নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য কেবল একটি গোষ্ঠী বা প্রতীকী কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আঘাত নয়; এটি দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার বা ছয় কোটির বেশি নাগরিকের সম্মান ও মর্যাদাকেই প্রত্যক্ষভাবে অবমাননার শামিল।
এই প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে নারী ইস্যুটি অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’
নারী ক্ষমতায়নের বদলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল হিসেবে নারীদের মর্যাদা ও রাজনৈতিক অবস্থান আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া শামীম আহসানের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব যেখানে নারীদের সম্মান দেখানোর কথা বলছেন, সেখানে দলের একজন প্রার্থীর প্রকাশ্য অবমাননাকর বক্তব্য সেই অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।’
একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে আরও সংযম ও সংবেদনশীল আচরণ প্রত্যাশিত উল্লেখ করেন এই শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেন যে, নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হলে গণতন্ত্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই বিতর্কের পর মো. শামীম আহসান টাইমসের কাছে স্বীকার করেন যে, দলীয় সাংগঠনিক চাপে তিনি বক্তব্যটি প্রত্যাহার করেছেন। সেইসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাও চান তিনি।
তবে শেহরীন আমিন ভূঁইয়ার মতে, ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়তে চাইলে কেবল ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে ভাষা ও আচরণে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাই আসল পরীক্ষা।
সমালোচকরা বলছেন, যে বক্তব্য আদর্শিকভাবে ভুল হলে স্বতঃস্ফূর্ত অনুশোচনা দেখা যেত, সেখানে ‘চাপের মুখে’ ক্ষমা চাওয়া প্রমাণ করে সমস্যাটি ব্যক্তি নয় বরং সেই সাংগঠনিক সংস্কৃতি, যেখানে এমন ভাষা প্রথমে বলার সাহস পাওয়া যায় এবং পরে কেবল পরিস্থিতি বিবেচনায় তা প্রত্যাহার করা হয়।
এই বাস্তবতা জামায়াতে ইসলামীর নারীবিষয়ক অবস্থানকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করার একটি লক্ষ্যমাত্রা বা প্রস্তাবনা ছিল। তবে, জামায়াতে ইসলামী সেখানে একটি আসনেও কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।
এক্ষেত্রে নীতিগত বিষয়ে একমত হতে না পারার কারণে জামায়াত এবার নারী প্রার্থী দিতে পারেনি বলে আগেই জানিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সব মিলিয়ে, জামায়াতে ইসলামীর এই দুই বিপরীতমুখী বক্তব্য নতুন করে সেই মৌলিক প্রশ্নই সামনে আনে—আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নারীর সম্মান কি কেবল একটি নির্বাচনী স্লোগান হিসেবেই ব্যবহৃত হবে, নাকি তা রাজনৈতিক চর্চা, ভাষা ও আচরণেও বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হবে?
নইলে ‘মায়ের জাত’ বলে উচ্চারিত শ্রদ্ধা আর ‘বেশ্যাখানা’ বলে ছোড়া গালির মাঝখানে নারীর অবস্থান থেকেই যাবে চরমভাবে অস্পষ্ট, অনিরাপদ ও অপমানজনক।


