ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘নিরাপদ, সমঅধিকারভিত্তিক ও বৈষম্যহীন’ ক্যাম্পাস নিশ্চিতের দাবিতে ‘প্রশাসন পোড়াও বারবিকিউ’ আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নেতৃবৃন্দ এবং ঢাবির একদল নারী শিক্ষার্থী।
রোববার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে এ আয়োজন করা হয়। আয়োজন শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের পাঁচ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বী, ডাকসুর সদস্য হেমা চাকমা, শামসুন্নাহার হলের সহসভাপতি (ভিপি) কানিজ কুররাতুল আইন, এবং বিভিন্ন বিভাগ ও হলের নারী শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন হেমা চাকমা। তিনি বলেন, ‘আজগুবি “অশালীনতা” প্রতিরোধে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পর কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’
‘একই সঙ্গে রাত ১০টার পর মল চত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের দেখা গেলে তাদের সেখান থেকে জোরপূর্বক চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা কোনো লিখিত নীতিমালায় নেই, কোনো গণবিজ্ঞপ্তিতে নেই, কোনো আইনি ভিত্তিও নেই। প্রশাসন বেআইনিভাবে এটি কার্যকর করছে। নিরাপত্তার নামে প্রশ্ন, জেরা ও হয়রানির ঘটনা নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
একই জায়গায় পুরুষ শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে অবস্থান করা ও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘এই দ্বিমুখী আচরণ স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়। বিশেষ নিরাপত্তার নামে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে বৈষম্য ও হয়রানি চলছে।’
‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সুরক্ষার অজুহাতে নারীদের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার খর্ব করা, নারীদের প্রতি কাঠামোগত বৈষম্য। যতদিন না এই বৈষম্য দূর করে নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে উঠছে, আমরা প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে থাকব।’
এই প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আজ প্রতীকী কর্মসূচি ‘প্রশাসন পোড়াও বারবিকিউ’ আয়োজন করেছে এবং নারী বান্ধব ক্যাম্পাসের দাবিতে প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিতে যাবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইমু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। এজন্য প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল গাড়ি এবং টহল বাড়ানো এবং ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রয়োজন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
স্মারকলিপিতে উল্লিখিত তাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নারীদের বিশেষ নিরাপত্তার নামের আড়ালে চলমান সকল ধরনের হয়রানি এবং বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ অবিলম্বে বন্ধ করা। পাশাপাশি টিএসসির অপ্রচলিত ও অকেজো নারী টয়লেট দ্রুত সংস্কার করার মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য ছাত্রী টয়লেট নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ সকল নারী শিক্ষার্থী, সেসহ অনাবাসিক ও ভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র জমা সাপেক্ষে যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে পুনর্গঠন এবং দ্রুত কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। এর পাশাপাশি, হলের আবাসিক ছাত্রীদের মা-বোনদেরও তাদের পরিচয়পত্র জমা এবং আবেদন সাপেক্ষে ছাত্রী হলে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।
এসব দাবি মূলত নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে সমানাধিকারভিত্তিক এবং নিরাপদ করার উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে গঠিত।
এর আগে, লিখিত কোনো নীতি না থাকলেও মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রবেশে নারী শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় ‘লিঙ্গবৈষম্যের’ অভিযোগ জোরালো হলে ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা এই প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
গত সপ্তাহে একাধিক নারী শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় মাঠের ফটকে আটকে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে জানানো হয়, বিকাল ৫টার পর নারী শিক্ষার্থীরা মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে এ নিষেধাজ্ঞা পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।


