নবাব সিরাজউদ্দৌলা— বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক নাম। তাকে নিয়ে খান আতাউর রহমান নির্মাণ করলেন ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। ১৯৬৭ সালের ১২ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়া ছবিটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম ক্লাসিক।
চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামসুল আলম বাবু জানান, ছবিটি তখন বাংলা ও উর্দু দুই ভার্সনে নির্মিত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাপারটি কিন্তু বাংলায় শুটিং করে উর্দুতে ডাবিং— এমন ছিল না। আগে বাংলায় শট নিয়ে, পরে উর্দুতে শট নিতে খান আতা। তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশেই ছবিটি সুপারহিট ব্যবসা করেছিল।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের আমলে দাঁড়িয়ে একজন বাঙালি শাসকের ইংরেজবিরোধী লড়াই নিয়ে ছবি বানানো ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়। তবু খান আতাউর রহমান এই ছবি হাতে নেন সচেতনভাবেই। তার লক্ষ্য ছিল ইতিহাসের মাধ্যমে সমকালীন বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থানকে ইঙ্গিত করা। চিত্রনাট্য তৈরিতে ইতিহাসের তথ্যের পাশাপাশি নাটকীয় রূপক ব্যবহার করেন, যাতে ছবিটি নিছক বায়োপিক না হয়ে প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছবিটি যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে, তা ষাটের দশকের বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে স্পষ্টভাবে মিলে যায়। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ ও ষড়যন্ত্রকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা মূলত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার প্রতি প্রতিবাদ। এই কারণেই ছবিটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভূমিকায় আনোয়ার হোসেনের অভিনয় এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি। সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা, রাগ ও অসহায়ত্বের প্রকাশ—সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রটিকে স্মরণীয় করে তুলেছেন। সহশিল্পীদের অভিনয় ছবিটির ঐতিহাসিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
ছবিটির সঠিক বাজেট সম্পর্কে খুব একটা তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বেশ বড় বাজেট ছিল তা বুঝা যায় ছবির সেট, পোশাক ও যুদ্ধদৃশ্যের আয়োজন দেখে। বিশেষ করে দরবার ও যুদ্ধের দৃশ্যগুলোতে যে ভিজ্যুয়াল স্কেল দেখা যায়, তা সেই সময়ের বাংলা ছবির বিরল ছিল। সাউন্ড ডিজাইন ও সংগীতও ছবির আবহকে অর্থবহ করেছে। খান আতাউর রহমান নিজেই সংগীত পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন।
সমালোচকরা ছবিটির অভিনয় ও নির্মাণশৈলীর প্রশংসা করলেও কেউ কেউ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিশেষ করে সিরাজউদ্দৌলাকে অতিমাত্রায় নায়কোচিত দেখানো হয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠে। তবে এই সমালোচনাই ছবিটির রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। কারণ নির্মাতারা ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন জাতিগত আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তুলতে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ক্লাসিক হয়ে উঠেছে কারণ এটি সময়কে অতিক্রম করতে পেরেছে। এটি শুধু অতীতের গল্প বলে না, বরং প্রতিটি প্রজন্মকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—ক্ষমতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং স্বাধীনতার মূল্য নিয়ে। রাজনৈতিক সাহস, শক্তিশালী অভিনয়, ঐতিহাসিক প্রতীকবাদ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার সম্মিলন এই ছবিটিকে বাংলা সিনেমার স্থায়ী সম্পদে পরিণত করেছে।


