তিতাসের ১০ শতাংশ গ্যাস যাচ্ছে কই?

তিতাসের ১০ শতাংশ গ্যাস যাচ্ছে কই?
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর ইস্কাটনের একটি ছয়তলা ভবনে বৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে মাত্র ৬টি, অথচ ১৫টি ফ্ল্যাটের গৃহিণীরাই পাইপলাইনের গ্যাসে দিব্যি চুলা জ্বালাচ্ছেন। প্রতি মাসে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির হাতে নির্ধারিত টাকা তুলে দিয়েই বিগত এক দশক ধরে চলছে এই অবৈধ কারবার।

ইস্কাটনের এই চিত্রটি আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দেশজুড়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিশাল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে থাকা এক গ্যাংগ্রিনের প্রতীকী রূপ। যখন বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সার কারখানা তীব্র গ্যাস সংকটে ধুঁকছে, ঠিক তখনই রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস নথিপত্রে স্রেফ ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিতাসের সরবরাহকৃত মোট গ্যাসের প্রায় এক-দশমাংশ বা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশই ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। পরিমাপ অনুযায়ী, কোম্পানিটি এক বছরেই ১৪৪ কোটি ঘনমিটার গ্যাস হারিয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। অথচ মাত্র চার বছর আগে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় পাঁচ গুণে।

নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানে ধরা পড়া হাজার হাজার অবৈধ সংযোগের তথ্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সিস্টেম লসের এই বিপুল অঙ্কের বড় অংশই আসলে কারিগরি অপচয় নয়-সুপরিকল্পিত গ্যাস চুরি।

গত ১৩ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার শাহজালাল হাউজিংয়ে অভিযান চালিয়ে ১০৬টি ডাবল বার্নার ও ১৮টি একক বার্নারের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই দিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার চাঁদনী হাউজিংয়ে আরেক অভিযানে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ ৬০টি ঘরের প্রায় ২০০টি ডাবল বার্নার চুলার সংযোগ কেটে দেয় কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর সাভারের আশুলিয়া ও গোড়াট এলাকায় ৩ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন বিচ্ছিন্নসহ প্রায় ৭০০টি অবৈধ আবাসিক বার্নার উচ্ছেদ করা হয়। সাভারের ওই সংযোগগুলোতেই প্রতি মাসে আনুমানিক ১৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকার গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার হতো।

সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনমিটার, যার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনমিটার। এই বিশাল ঘাটতির মধ্যেও তিতাসের সিস্টেম লস লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ২ শতাংশ সীমার মধ্যেই ছিল। কিন্তু পরবর্তী তিন বছরে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো তৈরি হয়নি।

আরও পড়ুন

বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিতাস লাখ লাখ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দাবি করলেও প্রতি বছর উচ্ছেদের সংখ্যা কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি অবৈধ আবাসিক সংযোগ এবং ৫৭৬টি বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর আগের বছর যেখানে ২ লাখ ৫০ হাজারটি অবৈধ সংযোগ ও ৪২০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়েছিল, তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজারটি সংযোগ ও ৩৯০ কিলোমিটার পাইপলাইন।

উচ্ছেদ অভিযানের এই স্থায়ী সমাধান না হওয়া নিয়েও উঠছে বড় প্রশ্ন। সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শেষ করে তিতাসের দল চলে যাওয়ার পরপরই আবার নতুন করে সংযোগ জুড়ে দেওয়ার অভিযোগ অহরহ। ফলে অভিযানগুলোর প্রকৃত কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তিতাসের আওতাধীন জেলাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও মুন্সীগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ চুরির আধিক্য সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাসের নিজস্ব কর্মী, কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারদের প্রত্যক্ষ সায় ও সহযোগিতা ছাড়া এমন মহামারী আকারের চুরি অসম্ভব। কিন্তু এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে টেকসই পদক্ষেপের কোনো নজির নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম এ বিষয়ে বলেন, তিতাসের সিস্টেম লস কেন এত দিন ধরে এত বেশি এবং তা কেন ক্রমাগত বাড়ছে, তার সঠিক জবাব তিতাসকেই দিতে হবে।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই অতিরিক্ত সিস্টেম লস কেন বছরের পর বছর ধরে চলছে এবং তা কেন দিন দিন বাড়ছে, তা ব্যাখ্যার জন্য তিতাস নিজেই সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে বাইরে থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলা যায়, এখানে নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের গ্যাস চুরির বিষয় জড়িয়ে আছে। বিষয়টি দেশবাসীর কাছে তিতাসের স্পষ্ট করা উচিত।’

তিতাস কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ বিতরণ ব্যবস্থা, পাইপলাইনের ক্ষয় ও লিকেজ, মাটির গভীরে পাইপ দেবে যাওয়া এবং অন্যান্য সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজের সময় অবকাঠামোগত ক্ষতির অজুহাত দেখান। তবে গত মাত্র পাঁচ বছরে কেন এই লস এমন জ্যামিতিক হারে বাড়ল, তার কোনো যুক্তিসংগত কৈফিয়ত দিতে পারেনি কোম্পানিটি।

টাইমসের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি জানতে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, কেবল কারিগরি ত্রুটি দিয়ে এই বিপুল অঙ্কের চুরি ঢাকা সম্ভব নয়।

টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কারিগরি ক্ষতি বা টেকনিক্যাল লস কোনোভাবেই দুই থেকে তিন শতাংশের বেশি হতে পারে না। এর বাইরের পুরোটাই মূলত চুরি, যা কেবল মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়।’

অধ্যাপক তামিম মনে করেন, এলপিজি এবং পাইপলাইনের গ্যাসের মূল্যের বিশাল ব্যবধান ও অবৈধ সংযোগ পাওয়ার সহজলভ্যতাই মূলত চোরদের উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের মধ্যেও সস্তা পাইপলাইনের গ্যাসকে ‘নিজের অধিকার’ মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

সংকটের সমাধানে ভারী ভর্তুকি প্রত্যাহারের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন বাসাবাড়িতে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার টাকায় যে গ্যাস পাচ্ছে, তাতে সরকার বাস্তবে ৩ হাজার টাকারও বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে। এই ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে আমদানি করা মূল্যে মিটারের মাধ্যমে সবাইকে বৈধ সংযোগ দেওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি বিল বেড়ে প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা হলেও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ পেলে মানুষ তা মেনে নেবে। এরপরও যারা অবৈধ সংযোগ নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad