অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড: তুহিনের অপরাধের ইতিহাস বহু পুরোনো

অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড: তুহিনের অপরাধের ইতিহাস বহু পুরোনো
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লায় ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিনের কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এলাকার মানুষের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের অনেক আগে থেকেই তুহিন নানা ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার বাসিন্দারা জানান, কিশোর বয়স থেকেই তুহিন অপরাধের পথে পা বাড়ায়। তবে তার পরিবার এসব কথা মানতে নারাজ।

পুলিশ জানায়, অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটি তুহিনের বাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতীম বাধা দেয়, আর তাতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সানন্দার মৈশান বাড়ি এলাকার তুহিন চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। স্থানীয়রা জানান, দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক সহপাঠীকে মারধর করায় তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর সে আর কখনো স্কুলে ফিরে যায়নি।

স্কুল ছাড়ার পর তুহিন আস্তে আস্তে একদল কিশোর ও যুবকের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, এই দলটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও কোটবাড়ি এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এলাকাবাসীর মতে, এই গ্যাংটি ছাত্রীদের উত্যক্ত করা, কোটবাড়ি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় ঘুরতে আসা মানুষকে ভয় দেখানো, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও বাইক চুরির মতো কাজে জড়িত ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ হোসেন বলেন, ‘তুহিনের চেয়ে বড় বয়সের ছেলেরাও তার সঙ্গে আড্ডা দিত।’ কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, ভয়ে অনেকেই পুলিশের কাছে অভিযোগ করার সাহস পেতেন না।

এমনকি একটি বাইক চুরির ঘটনায় সদর দক্ষিণ থানায় তুহিনের বিরুদ্ধে জিডিও করা হয়েছিল। তবে আগের এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ মুখ খোলেনি।

কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে পরিবার ও সামাজিক ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘কোনো শিশু বা কিশোর রাতারাতি অপরাধী হয়ে ওঠে না। অপ্রতীম হত্যার আসামি তুহিন কিংবা ফাহাদরা একদিনে অপরাধী হয়নি। দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার কারণেই তারা আজ এই পথে।’

আরও পড়ুন

অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই তা প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখনই লাগাম না টানলে ভবিষ্যতে আমাদের আরও ভয়ংকর ঘটনা দেখতে হবে।’

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, গত কয়েক মাসে কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্যকে ধরা হয়েছে এবং আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

তবে তিনি বলেন, ‘এসব অপরাধীর অনেকেই জামিনে বা জেল থেকে বেরিয়ে আবার আগের অপরাধেই ফিরে যায়।’

শুধু পুলিশ দিয়ে কিশোর গ্যাং দূর করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিবার, সমাজ, রাজনীতিবিদ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবাইকে এক হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

এদিকে, সোমবার সকালে তুহিনের টিনশেড ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। ভেতরে তার মা শিরিন আক্তার ছোট ছেলেকে নিয়ে ছিলেন।

জানালা দিয়ে শিরিন আক্তার দাবি করেন, ছেলে কী করত তা তিনি জানতেন না। যদিও এর আগের দিনই তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন—ছেলে দোষী হলে যেন তার শাস্তি হয়।

তিনি জানান, তোশকের নিচে আইফোনটি লুকিয়ে রাখা ছিল। সেটি পেয়েই তিনি পুলিশের হাতে তুলে দেন। তবে ফোনটি সেখানে কীভাবে এল, সে বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারেননি। তবে প্রতিবেশীরা এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।

অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে। ফুটেজে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে অপ্রতীম তুহিনের সঙ্গে হাঁটছিল।

এর পর পুলিশ তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আইফোনটি উদ্ধার করে।

পুলিশের মতে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে তুহিন অপ্রতীমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে নিয়ে যায়। সেখানে তুহিন ফোনটি কেড়ে নিতে গেলে অপ্রতীম বাধা দেয়। হাতাহাতির একপর্যায়ে তাকে মারাত্মক মারধর করা হয়, এতেই তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। অভিযুক্ত দুজন কিশোরকে সংশোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘অপ্রতীমকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা খুবই মর্মান্তিক ও নিন্দনীয়। ক্যাম্পাসের আশপাশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’

অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান টাইমসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাতে তারা তালিকা ও পরিকল্পনা তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, ‘আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে, পুলিশকে কাজ করতে হবে, পাশাপাশি নেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তবেই কিশোর গ্যাংয়ের এই তাণ্ডব কমানো সম্ভব।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad