অবহেলায় মলিন ‘বীর সপ্তক’

অবহেলায় মলিন ‘বীর সপ্তক’
ছবি: সৈয়দ মাহমুদুর রহমান/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বনানী পেরিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে ইট ও পোড়ামাটির নকশায় তৈরি একটি স্থাপনা। স্তম্ভের গোলাকার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় আকাশ। তবে কাছে গেলে বদলে যায় দৃশ্য।

স্থাপনাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বুনো লতাগুল্ম। লতাপাতায় ঢেকে গেছে নিচের ময়লার ঝুড়িও। একসময় আলোকস্তম্ভে লাগানো বাতিগুলো এখন নেই। চুরি হয়ে গেছে সেগুলো। ধুলা ও ময়লার পুরু আস্তরণে মলিন হয়ে গেছে দেয়ালের টেরাকোটা চিত্রকর্ম। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্যের পাশাপাশি সেখানে থাকা সাত বীরশ্রেষ্ঠের মুখও হারিয়েছে আগের ঔজ্জ্বল্য।

ছবি: সৈয়দ মাহমুদুর রহমান/ টাইমস

দূর থেকে দেখলে পরিত্যক্ত কোনো দেয়াল কিংবা অসমাপ্ত নির্মাণকাজ বলেও মনে হতে পারে স্থাপনাটিকে। অথচ পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়ানের বিপরীতে থাকা এই স্থাপনাটির দুই স্তম্ভে একসময় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের মুখ।

‘বীর সপ্তক’ নামের এই স্থাপনায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্য নিয়ে তৈরি বিশাল টেরাকোটা রিলিফ প্যানেল। যুদ্ধ ও আত্মত্যাগের মুহূর্তগুলো সেখানে স্থির হয়ে আছে শিল্পীর নির্মাণে।

বনানী ফ্লাইওভার নির্মাণের পর এর নিচে তৈরি হওয়া বড় খোলা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও-ওয়েস্ট) এর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল ফাঁকা জায়গাটিকে সবুজ, অর্থবহ ও নগরীর সামগ্রিক দৃশ্যপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।

প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছিল ২০ কোটি টাকার বেশি। শুধু আলোকসজ্জার জন্যই খরচ হয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

একসময় লতাগুল্ম ও ফুলের গাছে ঘেরা ছিল ‘বীর সপ্তক’। সন্ধ্যা নামলে আলো জ্বলে উঠত। সেই আলোয় ফুটে উঠত দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া সাত বীরশ্রেষ্ঠের মুখ।

ছবি: সৈয়দ মাহমুদুর রহমান/ টাইমস

এখন সেখানে মরিচা ধরা কাঠামো আর বুনো উদ্ভিদের দখল। দীর্ঘদিনের অযত্নে এমন অবস্থা হয়েছে যে, একসময় পরিকল্পিতভাবে নির্মিত একটি নাগরিক স্থাপনা ছিল এটি, তাই বোঝা কঠিন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনার মতো ‘বীর সপ্তকও’ ধীরে ধীরে আরও অবহেলার মধ্যে পড়ে।

স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এটি আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়নি। ফলে সরকারি অবকাঠামোর মতো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের আওতায়ও এটি আসেনি।

ছবি: সৈয়দ মাহমুদুর রহমান/ টাইমস

‘বীর সপ্তক’-এর স্থপতি এহসান খান স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, বিমানবন্দর সড়কের ল্যান্ডস্কেপ নকশার অংশ হিসেবেই এটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

ওই জায়গায় আগে ‘ঢাকা গেট’ নামে একটি স্থাপনা ছিল। সেটি ভেঙে ফেলার পর সেখানে একটি প্রবেশদ্বার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। সেখান থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘সবুজ স্মৃতিস্তম্ভের’ ধারণাটি আসে বলে জানান এহসান খান।

তার মতে, ‘বীর সপ্তক’-এর বর্তমান অবস্থা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর প্রতি দেশের সামগ্রিক অবহেলারই প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে নির্মিত অনেক স্থাপনাই এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পড়ে আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের জন্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্মরণে নির্মিত স্থাপনাটির বর্তমান চিত্রে শুধু অযত্নের ছাপ নয়, বিস্মৃতিরও ইঙ্গিত রয়েছে। বুনো লতা আর চুরি যাওয়া বাতির আড়ালে ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যাচ্ছে ‘বীর সপ্তক’-এর মুখগুলো। একই সঙ্গে মলিন হচ্ছে নগরীর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad