তাঁতের বুননে মিশ্রিপাড়ার রাখাইন ঐতিহ্য

তাঁতের বুননে মিশ্রিপাড়ার রাখাইন ঐতিহ্য
মিশ্রিপাড়ার রাখাইন তাঁতশিল্পী। ছবি: রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতশিল্প রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। একসময় প্রায় প্রতিটি রাখাইন নারীকে ছোটবেলা থেকেই তাঁত বোনা শিখতে হতো, যাতে পরিবারের পোশাকের প্রয়োজন মেটানো যায়। তখন কাপড় তৈরির এই দক্ষতা শুধু জীবিকার মাধ্যম ছিল না; এর মধ্য দিয়েই রাখাইন জনগোষ্ঠীর নকশা, রং, পোশাকের ধরন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে। রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্যদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভূমি দখল, জমি হারানো এবং অন্যত্র অভিবাসনের কারণে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রাখাইনপল্লি মিশ্রিপাড়ায় পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই কমে গেছে। তাদের দাবি, একসময় এই গ্রামে ৩০০’র বেশি রাখাইন পরিবার বসবাস করলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ২১টি পরিবার।

তাঁতে কাপড় বুনছেন তাঁতশিল্পীরা। ছবি: রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা/ টাইমস

জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যেও অবশিষ্ট অনেক পরিবার এখনো তাঁতশিল্প আঁকড়ে ধরে আছে। বাড়ির উঠানে কিংবা ঘরের একাংশে তাঁত বসিয়ে তারা শাল, চাদরসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করেন। তাদের কাছে এই কাজ একই সঙ্গে জীবিকার মাধ্যম এবং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি প্রচেষ্টা।

ছবি: রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা/ টাইমস

তবে রাখাইন তাঁতশিল্পীরা বলছেন, বোনা পণ্য তৈরি করে তারা যথেষ্ট আয় করতে পারছেন না। তাদের মতে, বর্তমানে এক কেজি সুতার দাম প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। একটি শাল বা বড় পোশাক তৈরি করতে বেশ ভালো পরিমাণের সুতা প্রয়োজন হয় এবং তা হাতে বুনতে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন। কিন্তু উৎপাদন খরচ ও শ্রমের তুলনায় তারা পণ্যের ন্যায্য দাম পান না। ফলে এই পেশা থেকে সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, দৈনন্দিন জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাঁতে কাপড় বুনছেন তাঁতশিল্পী। ছবি: রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা/ টাইমস

স্থানীয় বাঙালি সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন রাখাইনদের কাছ থেকে তাঁত বোনা শিখে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। এতে তাঁতজাত পণ্যের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হলেও একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—রাখাইন তাঁতশিল্পীদের নিজস্ব নকশা, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অধিকার কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে?

যদি যথাযথ সহায়তা, পণ্যের ন্যায্য মূল্য এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে আশঙ্কা রয়েছে যে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের তাঁতকেন্দ্রিক ঐতিহ্যও একদিন হারিয়ে যেতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad