একসময় গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য ছিল মাটির ঘর, টিনের চালা আর চারপাশে গাছ-গাছালিতে ঘেরা সবুজ পরিবেশ। গরমের দিনে ঠান্ডা আর শীতের দিনে উষ্ণ-প্রাকৃতিকভাবেই আরামদায়ক এসব মাটির ঘর ছিল গ্রামীণ মানুষের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল।
কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি, রুচির পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।
বিশেষ করে চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখনও কিছু মাটির ঘর চোখে পড়ে। তবে কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকায় অসংখ্য মাটির ঘর দেখা যেত, বর্তমানে সেখানে ইট, বালু, রড ও সিমেন্টের তৈরি পাকা-সেমিপাকা ভবন জায়গা করে নিয়েছে।
তাড়াশ উপজেলার দেওড়া গ্রামের স্থানীয়দের দাবি, এখনও গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িতে কোনো না কোনোভাবে মাটির ঘরের অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া দেশীগ্রাম ইউনিয়নের আড়ংগাইল গ্রামেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুরোনো মাটির ঘর।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেখানে লাল মাটি ও এঁটেল মাটি পাওয়া যেত, সেসব এলাকার মানুষ মাটির ঘর নির্মাণ করতেন। প্রথমে মাটি পানিতে ভিজিয়ে নরম কাদায় পরিণত করা হতো। এরপর সেই কাদা-মাটি দিয়ে দুই থেকে তিন ফুট চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হতো।
এক ধাপ দেয়াল নির্মাণের পর পাঁচ থেকে ছয় দিন রোদে শুকানো হতো। এভাবে ধাপে ধাপে ১২ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু দেয়াল তৈরি করা হতো। পরে দেয়ালের ওপর টিন, খড় বা ছনের চালা দেওয়া হতো। একটি ঘর তৈরি করতে সময় লাগত প্রায় দুই থেকে তিন মাস।
মাটির ঘরের দেয়াল শক্ত ও টেকসই করতে ভেতরের দিকে ধানের তুষের প্রলেপ এবং বাইরের দিকে চুন কিংবা আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া হতো। ফলে বড় ধরনের বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ না হলে এসব ঘর বহু বছর, এমনকি শত বছর পর্যন্ত টিকে থাকত।
স্থানীয়দের মতে, মাটির ঘর তৈরির উপযুক্ত সময় ছিল কার্তিক মাস। এ সময় সাধারণত বৃষ্টিপাত কম থাকায় মাটির দেয়াল সহজে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যেত।
তাড়াশ উপজেলার আট ইউনিয়নে মোট ২৫৪টি গ্রাম রয়েছে। আড়ংগাইল গ্রামের জাফর বলেন, একসময় দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও মাটির ঘরে বসবাস করতেন। নিয়মিত সংস্কার করলে এসব ঘর দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তবে এখন মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় সবাই পাকা বা সেমিপাকা বাড়ির দিকে ঝুঁকছেন।
তাড়াশ উপজেলার লাউতা গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল আজিজ বলেন, আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মাটির ঘর ছিল। মাটির ঘরে গরমের সময় ঠান্ডা আর শীতের সময় বেশ আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু এখন মানুষ আর আগের মতো মাটির ঘর তৈরি করতে চায় না। পুরোনো ঘরগুলোও ভেঙে পাকা বাড়ি তৈরি করছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের গ্রামের এই ঐতিহ্য একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
একই গ্রামের বাসিন্দা মোছা. ঝর্ণা খাতুন বলেন, আগে মাটির ঘর ছিল আমাদের গ্রামের স্বাভাবিক দৃশ্য। ঘরের চারপাশে গাছপালা থাকত, পরিবেশও অনেক সুন্দর ছিল। এখন মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো হয়েছে, তাই সবাই ইট-সিমেন্টের বাড়ি করতে চায়। মাটির ঘরকে এখন অনেকে পুরোনো দিনের জিনিস মনে করেন। অথচ এসব ঘরের সঙ্গে আমাদের শেকড় ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।
দেশীগ্রাম ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শ্রী মনোরঞ্জন সিং বলেন, আমার ওয়ার্ডে এখনও মাটির ঘরের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক পরিবার বাপ-দাদার তৈরি ঘর সংস্কার করে বসবাস করছে। তবে নতুন করে মাটির ঘর নির্মাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পুরোনো ঘরগুলোও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।
দেশীগ্রাম ইউনিয়নের আড়ংগাইল গ্রামের সাবেক মহিলা সদস্য মোছা. বিলকিছ খাতুন বলেন, আগে মাটির ঘর প্রচুর ছিল। এখন মানুষ অনেক উন্নত হয়েছে, তাই আগের মতো মাটির ঘর নেই। তবে আড়ংগাইল গ্রামে এখনও ১ হাজার ২০০টির বেশি মাটির ঘর রয়েছে বলে আমরা জানি। আমাদের ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো মাটির ঘর এখনও রয়েছে।
রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের মৌহার গ্রামের হালিম সেখ বলেন, প্রায় ৬০ বছর আগে আমি মাটির ঘরটি নির্মাণ করেছিলাম। তখন খরচ হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার টাকা। এখন একই ধরনের একটি মাটির ঘর তৈরি করতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকারও বেশি খরচ হতে পারে। আমাদের এলাকায় এখনও বেশ কিছু মাটির ঘর আছে।
আড়ংগাইল গ্রামের মজিদ বলেন, ‘এখনও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে বাপ-দাদার তৈরি মাটির ঘর প্রতিবছর মাটি দিয়ে সংস্কার করে বসবাস করছেন। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাটির ঘরের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে এই ঘরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।’
তাড়াশ উপজেলার এই জনপদের গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে মাটির ঘরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় ধনী-গরিব নির্বিশেষে অনেক পরিবার মাটির ঘরে বসবাস করত। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের কেউ কেউ মাটির তৈরি দোতলা বাড়িও নির্মাণ করতেন।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন রড, সিমেন্ট, ইট ও আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর তৈরি বাড়িই মানুষের পছন্দ। ফলে মাটির ঘর ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, মাটির ঘর শুধু একটি বসতবাড়ি নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার জীবনযাপন, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি ঐতিহ্যের শেষ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রাকৃতিকভাবে আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় উপকরণনির্ভর এই মাটির ঘরগুলো একসময় হয়তো থাকবে শুধু স্মৃতির পাতায়। তাই সময় থাকতে ঐতিহ্যবাহী এসব ঘরের কিছু নিদর্শন সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া জীবনযাত্রার একটি বাস্তব চিত্র দেখতে পারবে।


