জেল ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ সাবেক এনসিপি নেতা তানভীরের

জেল ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ সাবেক এনসিপি নেতা তানভীরের
Advertisement
Advertisement

জেলে ও রিমান্ডে থাকাকালে নির্যাতন, অজ্ঞাত ইনজেকশন প্রয়োগ, ইলেকট্রিক শক এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর।

শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

অসুস্থতার কারণে কথা বলতে না পারায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

লিখিত বক্তব্যে গাজী সালাহউদ্দিন বলেন, ‘৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে, নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের মাঝে সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি।’ জীবনের ঝুঁকি জেনেও এসব বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরতে তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন বলে জানান।

গাজী সালাহউদ্দিনের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং ৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান মামলাটির বাদী বলে তিনি জানান।

কারাগারে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তাকে বগুড়া কারাগারের একটি অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন সেলে রাখা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ ও ফ্যান ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। কারারক্ষীদের একটি অংশ তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করত বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কারাগারের খাবার খেয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

তার দাবি, শরীরে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে হাত-পা কাঁপলে ইনজেকশন দেওয়ার পর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে একজন চিকিৎসক তার স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান বলে দাবি করেন তিনি। সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করার সময়ও গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ করেন গাজী সালাহউদ্দিন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় আনা হয়।

কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং সালাউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, মোবাইল ফোনে কথা বলে, ভালো খাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।’

গাজী সালাহউদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কারাগারে ফেরার পথে সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে উঠে তাকে নির্যাতন করেন। তাদের একজন বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান ও তার ছেলে আনভীরের নাম উল্লেখ করে তাকে নির্যাতন করেন বলে দাবি করেন তিনি।

তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এনসিপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব আব্দুল আহাদ বলেন, তারা গাজী সালাহউদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫০টিরও বেশি ইনজেকশনের চিহ্ন পেয়েছেন। ‘তাকে কী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, কেন দেওয়া হয়েছে, এর মেডিকেল ইন্ডিকেশন কী ছিল, কিংবা তাকে ইনজেকশন দেওয়ার সময় কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন কিনা– এসব বিষয়ে আমরা কোনো সন্তোষজনক তথ্য পাইনি,’ বলেন তিনি।

ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ইলেকট্রিক শকের চিহ্নও পাওয়া গেছে। ‘আয়নাঘরে নির্যাতনের যে ধরনের বর্ণনা আমরা অতীতে শুনেছি– চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অভিযোগ, সেই ধরনের ঘটনা কি আমরা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশেও আবার দেখতে পাচ্ছি?’ তিনি প্রশ্ন করেন। ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়ে থাকলে এর কোনো চিকিৎসাগত কারণ ছিল কিনা, সেটিও তদন্তের দাবি জানান তিনি।

গাজী সালাহউদ্দিনের নিউরোলজিক্যাল ইভালুয়েশনে বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে জানিয়ে আব্দুল আহাদ বলেন, ডরসাল বা থোরাসিক ১২ নম্বর ভার্টিব্রার পর থেকে নিচের অংশে তার সেনসেশন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তিনি পা নড়াতে পারছেন না এবং প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছেন। চিকিৎসকদের বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিউরোজেনিক ব্লাডারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান নিউরোলজিক্যাল দুর্বলতা কতটা ও কবে পুনরুদ্ধার হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। তার মতে, ইলেকট্রিক শকের প্রভাবে স্পাইন, স্পাইনের নার্ভ রুট এবং পেরিফেরাল নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

গাজী সালাহউদ্দিনের সঙ্গে কী ঘটেছে তা জানতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আব্দুল আহাদ। তিনি বলেন, কীভাবে তিনি গ্রেপ্তার হলেন, পুলিশ হেফাজতে কী ঘটেছে, শরীরে ইনজেকশন ও ইলেকট্রিক শকের চিহ্ন কীভাবে এলো এবং এসবের পেছনে কোনো চিকিৎসাগত কারণ ছিল কিনা, সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করে স্ট্যাটাস দেন গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর। পরে তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলা সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল।

পরে গত বুধবার ঢাকার মিরপুর মনিপুরি পাড়ার একটি বাসা থেকে গাজী সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া ডিবি পুলিশ।

এনসিপি দলীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির ঘটনায় গত ৩১ জুলাই গাজী সালাউদ্দীন তানভীরকে দল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। গুরুত্ব বিবেচনায় পদক্ষেপ নেন এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন। ২০২৫ সালেও একবার দল থেকে তাকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ বাণিজ্য ও পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে প্রথম দফা অব্যাহতির পর সেই আদেশ প্রত্যাহার করেছিল এনসিপি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad