এ যেন অনেকটা ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠনের দৃশ্যই ফিরে এসেছে। এক ঝাঁক নতুন মুখের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন খালেদা জিয়া। এর আগে জিয়াউর রহমানের আমলে মন্ত্রিসভায় ছিলেন-খালেদা জিয়ার সরকারে এমন মুখ ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন।
ঠিক একই রকম চমক দেখালেন জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভা গঠনগত চমক ও বৈচিত্র্যের কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৫০ সদস্যের এই বিশাল মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক হলো নতুন মুখের প্রাধান্য।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন মা খালেদা জিয়া সরকারের মাত্র আটজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী। বাকি ৪২ জনই আগে কখনো দলীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন না। তবে নতুন হিসেবে পরিচিতি পেলেও এই ৪২ জনের মধ্যে দুইজন সদস্য ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের মন্ত্রিসভায়।
নতুন এই সরকারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সংসদীয় অভিজ্ঞতার চেয়ে তারুণ্য ও নতুন নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়া। মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন তিনজন। মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যদের মধ্যে অন্তত ৩০ জনই প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য হয়েছেন।
বেশিরভাগ মানুষই মনে করেছিলেন নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিসভা হবে, যেখানে অর্ধেকই হবেন পুরনো মন্ত্রীসভার সদস্য। তবে সেটি হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান পুরাতন প্রথা ভেঙে নতুনদের ওপর আস্থা রেখেই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। তার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণকেও চমক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ২৫ জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ২৪ জন। পূর্ণমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
এছাড়াও মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহসানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরীফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন, হাবিবুর রশিদ, রাজিব আহসান, আব্দুল বারী, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক নুর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ এবং আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এই তালিকায় জোটের শরিক ও তরুণ নেতৃত্বের প্রতিফলন বেশ জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।
তবে নতুনদের এই বিশাল সমারোহের মাঝে কিছু পরিচিত মুখের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বেশ অবাক করেছে। সবার জোরালো প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো ঝানু রাজনীতিবিদেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞদের রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবর্তে দল গোছানো এবং আগামী দিনে দলীয় কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সক্রিয় রাখার কৌশল থেকেই হয়তো তাদের মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি।
অবশ্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, ড. আব্দুল মঈন খানকে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে সংসদের উচ্চকক্ষের চেয়ারম্যান বা স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে গুঞ্জন রয়েছে। আর মন্ত্রিসভা গঠনের দিনই মন্ত্রীর মর্যাদায় মির্জা আব্বাসকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকারের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া খলিলুর রহমান। তার এই নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল কারণ সদ্য সমাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে তার ভূমিকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি একবার প্রকাশ্যেই দু’জন উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়েছে, যাদের একজন এই খলিলুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে তাকে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়োগ করেছিল। পরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর বিতর্ক শুরু হয়। এমনকি তার এই নিয়োগকে সশস্ত্র বাহিনী ভালভাবে নেয়নি বলেও তখন গুঞ্জন ছিল।
এসময় তার নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়, বলা হয় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অবশ্য এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা খলিলুর রহমান।
খলিলুর রহমানের এই নিয়োগ কেবল তার ব্যক্তিগত বিতর্কের কারণে নয়, বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী হিসেবেও দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা কেউ রাজনৈতিক সরকারের কোনো পদে আসীন হবেন না। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সেই অবস্থান আর ঠিক থাকল না।


