ওয়ানডে ক্রিকেট আবেদন হারিয়েছে, রমরমা টি-টোয়েন্টির এই যুগে কথাটা প্রায়ই শোনা যায়। ম্যাচের দৈর্ঘ্য, ক্রিকেটের এপ্রোচ এর অন্যতম কারণ। বুধবার আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-আফগানিস্তান তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেও এর আদর্শ উদাহরণ। আফগানদের ২২২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে দিয়ে খুব বেশি চাপে যে বাংলাদেশ তাদের রাখতে পেরেছে এমনটাও নয়। খেলা ডেথ ওভারে গেলেও টপ অর্ডারে দুটো ফিফটি, শেষ দিকে আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের ৪০ রানের ইনিংসে ৫ উইকেট ম্যাচ জিতল আফগানিস্তান।
যদিও আবু ধাবিতে এর চেয়ে কম রান ডিফেন্ড করে জেতার রেকর্ড আছে চারটি। বাংলাদেশ কোনোভাবে জিতলে সেটা হতো চতুর্থ সর্বনিম্ন সংগ্রহ নিয়ে জেতার রেকর্ড। তবে সেসব ছাপিয়ে ১৬৯টি ডট বল খেলার মাশুল বাংলাদেশ দিয়েছে ম্যাচ হেরে। বিশেষত মিডল ওভারের ব্যাটিং এপ্রোচ ছিল এক্স ফ্যাক্টর।অবশ্য মরুর বুকে গড়ে ওঠা আবু ধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেটের একটা বিশেষত্ব আছে। ম্যাচের শুরুতে পেসাররা সাহায্য পান, আর শেষদিকে স্পিনাররা। বাংলাদেশের বিপক্ষে রান তাড়ায় নেমে অবশ্য সেসব নিয়ে শুরুর দিকে খুব বেশি মাথা ঘামাতে হয়নি আফগানদের। ওপেনিং জুটিতেই ৫২ রান তুলে ফেলেন ইব্রাহিম জাদরান ও রহমানউল্লাহ গুরবাজ। আবু ধাবির টার্নিং উইকেটে সেটা আদর্শ ব্যাটিং এপ্রোচ।
স্পিনাররা ফ্লাডলাইটের নিচে সাহায্য পান, এই থিওরি প্রমাণ করতেই বোধহয় তানভীর ইসলাম করলেন দারুণ এক টার্নিং ডেলিভারি। উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে ইনসাইড আউট এক শট খেলতে গিয়ে স্টাম্পড হন জাদরান। দুই ওভার পর তানজিম হাসান সাকিবের দুর্দান্ত লেংথ বলে খেলার জায়গা না পেয়ে স্লিপে তানজিদ হাসানের হাতে ক্যাচ দেন সেদিকউল্লাহ আতাল। শুরুর সেই স্বস্তি ক্ষণিকের জন্য মিলিয়ে যায় আফগানদের। অবশ্য এরপর রহমত শাহ আর গুরবাজের ৭৮ রানের জুটি গলার কাঁটা হয়ে আসে বাংলাদেশের জন্য। ১১১ বলে গড়া এই জুটি ভেঙেছেন মিরাজ, গুরবাজকে বোল্ড করে। ফিফটি করা এই ব্যাটারের পর রহমতকে বাউন্সারে চমকে উইকেট নিয়েছেন তানজিম। ৭ ওভার বল করে এক মেইডেন-সহ ৩১ রানে ৩ উইকেট নেন এই পেসার।
অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়লেও আজমতউল্লাহর ৪৪ বলে ৪০ রানের ইনিংসে জয়টা সহজ হয়ে যায় আফগানিস্তানের। আউট হওয়ার আগে তানজিমকে মেরেছেন টানা তিন চার। এরপর হাশমত খেলেন ৩৩* রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস।
‘নেভার রান অন আ মিসফিল্ড’, ক্রিকেটে এই কথাটা যেন এক আস্ত বেদবাক্য। কোনো ফিল্ডার বল ধরতে ব্যর্থ হয়েছে, আর সেই সুযোগে রানের জন্য ব্যাটাররা ছুটেছে, ফলস্বরুপ একজন রান আউট হয়নি, এমনটা খুব কমই দেখা গেছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টসে জিতে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের দুই ব্যাটার তাওহিদ হৃদয় আর মেহেদী হাসান মিরাজকেও দেখা গেল সেই একই চিত্রে।
চতুর্থ উইকেটে দুজনের ১০১ রানের জুটি ততক্ষণে জমজমাট। বাংলাদেশও এগোচ্ছিল বড় সংগ্রহের দিকে। কিন্তু ইনিংসের ৩৬ তম ওভারের দ্বিতীয় বলে এলো সেই এলোমেলো মুহুর্তটা। স্পিনার নাঙ্গোলিয়া খারোটের বলটা কভারে ঠেলে পপিং ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এলেও মিরাজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন হৃদয়। আফগান অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ ডাইভ করে বলটা ঠেকালেন বটে, তবে হাতে ঠিক জমাতে পারলেন না। সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে হৃদয় সিংগেলের জন্য ছুটলেন, মিরাজ একবার ছুটতে গিয়েও থেমে গেলেন, ততক্ষণে পিচের অর্ধেকটা পেরিয়ে এসেছেন হৃদয়। বল কুড়িয়ে হাশমত থ্রো করেছেন স্ট্রাইকিং এন্ডে। ব্যাটিং এন্ডে ফিরে যেতে যেতে স্টাম্প ভেঙে দিয়েছেন উইকেটকিপার গুরবাজ।
হতাশ হৃদয়কে ফিরতে হয় ৮৫ বলে ৫৬ রানের ইনিংস খেলে। ভাঙে মিরাজের সাথে বড় কিন্তু ধীরগতির জুটি। এই জুটিতে ফিফটি পেয়েছেন দুজনই। কিন্তু ১৪২ বলের এই সাবধানী জুটির মাশুলও দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। হৃদয়ের পর ফিরেছেন অধিনায়ক মিরাজও। ব্যক্তিগত ৬০ রানে রশিদ খানের গুগলি মিস করেছেন, হয়েছেন এলবিডব্লিউ। এই লেগ স্পিনার এরপর নিয়েছেন আরো দুই উইকেট। একইভাবে গুগলিতে পরাস্ত হয়েছেন জাকের আলী অনিক, নুরুল হাসান সোহানেরও একই পরিণতি। ২০০-তম উইকেটের দেখা পাওয়া রশিদ যেন তাদের সামনে ধরা দিয়েছিলেন দুর্বোধ্য এক প্রশ্ন হয়ে।
রশিদের মতো বাংলাদেশি ব্যাটারদের ভুগিয়েছেন পেসার আজমতউল্লাহও। নতুন বল কিংবা পুরনো বল; ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে বল করতে এসে পেয়েছেন সাফল্য। ইনিংসের চতুর্থ ও ষষ্ঠ ওভারে নিয়েছেন তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্তর উইকেট। ১৮ রান করা ওপেনার তানজিদ ফিরেছেন গুরবাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে। তিনে নামা শান্ত, মিড অফে রীতিমতো ক্যাচিং অনুশীলন করেছেন হাশমতকে। অভিষিক্ত সাইফ হাসান পাঁচ চারে দারুণ শুরু করলেও খারোটের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন।
মাঝে হৃদয়-মিরাজের জুটি একপাশে সরিয়ে রাখলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে তেমন কিছুই ছিল না। অথচ পাওয়ারপ্লে শেষে সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ৫৫। মিডল ওভারে রশিদের ওই স্পেলের প্রভাব পড়েছে ডেথ ওভারের ব্যাটিংয়ে, মাত্র ৪৪ রানে হারিয়েছে শেষ পাঁচ উইকেট। এর সাথে ৫৫% ডট বল খেলাও একটা এক্স ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য। শেষ দিকে তানজিমের ১৭ আর তানভীরের ১১ রানের ইনিংস না এলে দুইশো পেরোনোও কঠিন হত বাংলাদেশের জন্য।


