বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংককে ১ হাজার ৫শ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৯০ দিনের জন্য দেওয়া এই তারল্য সুবিধার মুনাফার হার ১১.৫০ শতাংশ।
এবি ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৬ নভেম্বর গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই ধারের বিষয়টি অনুমোদন করেন। ওইদিনই ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিশ্রুতিপত্র জমা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে পরিচালিত এবি ব্যাংকের হিসাবে ধারের টাকা জমা হয়।
এর আগেও তিন ধাপে ৭৮০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে ব্যাংকটি যার মধ্যে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির কাছে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটি দুর্দশায় পড়ায় আমানতকারীদের দিক থেকে টাকা উত্তোলনের ব্যাপক চাপ এসেছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার কোটি টাকার বেশি আটকে গেছে। এমনকি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ৫২৮ কোটি টাকার এলসির অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না ব্যাংকটি।
এবি ব্যংকের নথি সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গত ৩ নভেম্বর গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে ৬ হাজার কোটি টাকা ধার চায় এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এরপর ১২ নভেম্বরে তাৎক্ষণিক তারল্য সহায়তা হিসেবে ২,৫০০ কোটি টাকা ধার চাওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে ব্যাংকটির পর্ষদ। এর প্রেক্ষিতে টাকা ধার চেয়ে পরের দিন গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠান ব্যাংকটির চেয়ারম্যান কাইজার এ চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান।
চিঠিতে লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দিক থেকে ব্যাপক হারে অর্থ উত্তোলনের চাপ এসেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গ্রাহকরা ৮৪২ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যে ক্লিয়ারিং একাউন্ট পরিচালনা করা হয় সেখানে মাত্র ৬.৪২ কোটি টাকা জমা আছে।
পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় গ্রাহকরা অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না যা আমানতকারী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমরা অধিকাংশ গ্রাহকেরই চাহিদা পূরণ করতে পারছি না যা শাখাগুলোতে ব্যাপক বিশৃংখলার ঝুঁকি তৈরি করেছে,’ লেখা হয় চিঠিতে।
এবি ব্যাংকের পর্ষদের নথি থেকে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৪ কোটি টাকা আটকে গেছে ব্যাংকটিতে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০২ কোটি টাকা, পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির ৩৫ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৩৭৮ কোটি টাকা, আশার ১ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভলপমেন্ট লিমিটেডের ৬ কোটি টাকা, ডিপিডিসির ১৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডের ১২ কোটি টাকা, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের ২৭ কোটি টাকা, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ৯ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য।
এবি ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের ১২ এপ্রিল। ১৯৮৩ সালেই এটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। সেবায় উৎকর্ষ ঘটিয়ে একসময় গ্রাহক আকর্ষণে অন্যতম সেরা হয়ে উঠেছিল ব্যাংকটি। কিন্তু পরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং উদ্যোক্তাদের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কারণে ব্যাংকটির আর্থিক সূচক ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ এবি ব্যাংকের মোট খেলাপি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশ। ব্যাংকটির ঋণের ৫৬ শতাংশই শীর্ষ ২০ গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত।
গত কয়েক বছরে ব্যাপক লুটপাটের কারণে ২০২৪ সালে রেকর্ড লোকসান করেছে একসময় ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড দেওয়া ব্যাংকটি। এবি ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালে সমন্বিতভাবে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২১ টাকা ২৮ পয়সা। ফলে গত বছর ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে ব্যাংকটির মুনাফা হয়েছিল ৯০ কোটি টাকা।


