অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেন, যার উদ্দেশ্য ছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তাঁর প্রশাসনের একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা। তিনি বলেছিলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হবে নতুন সরকারের মূল ভিত্তি। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সকল সদস্য তাঁদের আয় ও সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন।
মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো পূরণ হয়নি।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বারবার আশ্বাস সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত একজন উপদেষ্টারও সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পদের বিবরণ নিয়ে সরকারে এই নীরবতা কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি; তাদের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় ইউনূস জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি স্বচ্ছতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
তিনি তখন বলেছিলেন, “বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। আমাদের সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের আয় ও সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করবেন। এই নিয়ম ধীরে ধীরে সকল সরকারি কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে।”
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে—এই ঘোষণায় জনমনে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আগের সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ ছিল। ইউনূসের প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা আলাদা হবে।
অনেকেই এখন বলছেন, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
ভাষণের প্রায় এক মাস পর, ১ অক্টোবর সরকার একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে। যার শিরোনাম ছিল ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’।
এই নীতিমালা অনুযায়ী, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে উপদেষ্টাদের নিজেদের এবং তাঁদের স্বামী বা স্ত্রীর আয় ও সম্পদের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হবে।
তবে নীতিমালায় এই বিবরণ জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এর বদলে সেখানে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা যদি “উপযুক্ত মনে করেন” তবে তিনি “যেভাবে ভালো মনে করবেন” সেভাবে তথ্যগুলো প্রকাশ করতে পারেন। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নীতিমালার এই ধারাটি মূল প্রতিশ্রুতির চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলেও তা জনসমক্ষে প্রকাশ করাকে বিবেচনামূলক বা ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। ফলে স্বচ্ছতা এখন রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
এভাবে সময় পার হওয়ার সাথে সাথে সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে।
ইউনূসের অধীনে নেওয়া কিছু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে গ্রামীণ নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে কি না এমন প্রশ্নও ওঠেছে। ড. ইউনূস দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। তাঁর নিয়োগের দুই মাসের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সরকারের মালিকানা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, যা আর্থিক নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন।
একই সময়ে ‘গ্রামীণ’ নাম ব্যবহার করে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং গ্রামীণ টেলিকমকে ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করার মধ্যেই এসব সিদ্ধান্ত ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অসদাচরণের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক উপদেষ্টাকে আওয়ামী লীগের সাবেক এক এমপির বাড়িতে চাঁদাবাজির ঘটনার সাথে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে। সরকার এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিলেও কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ঘোষণা করেনি।
উপদেষ্টাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মীদের বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মধ্যে কিছু অভিযোগের প্রাথমিক পর্যালোচনা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার মূল অঙ্গীকার ছিল দ্ব্যর্থহীন।
তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে সম্পদের বিবরণ কেবল জমা দিলেই হবে না, তা প্রকাশ করা হবে। এর জন্য ফরমও তৈরি করা হয়েছিল। অত্যন্ত জোরালোভাবে সম্পদের বিবরণ প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।”
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। এটি অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। এই সরকারের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের নেতৃত্ব দেওয়া। অনেক উপদেষ্টা নাগরিক সমাজ থেকে এসেছেন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পক্ষে কথা বলে সুনাম অর্জন করেছেন। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারাটা সরকারের একটি ব্যর্থতা।
টিআইবি’র এই কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন: “যদি লুকানোর কিছু না থাকে, তবে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? আর যদি লুকানোর কিছু থাকে, তবে সেটি কী?
জনগণের জানার অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, নিজ থেকে তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি কম ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
একই ধরনের মূল্যায়ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান উপদেষ্টার প্রথম ভাষণে দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্পষ্টত ভঙ্গ করেছে। উপদেষ্টারা সবাই যেমন বিবরণ জমা দেননি, তেমনি জনগণের সামনে কোনো তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, এই ব্যর্থতা জবাবদিহিতার বিষয়ে জনআকাঙ্ক্ষাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা বলেন, বছরের পর বছর ধরে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জনমতকে তোয়াক্কা না করার অভিযোগ ছিল। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারাও নিজেদের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখছেন।
অবশ্য সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সম্পদের বিবরণ প্রকাশের প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান।
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি তার আয় ও সম্পদের বিবরণ জমা দিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, এটি প্রকাশ করা ব্যক্তিগতভাবে উপদেষ্টাদের দায়িত্ব নয়।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, সাম্প্রতিক এক বৈঠকে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক উপদেষ্টা ইতিমধ্যে দুই বছরের আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন।
তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ৩১ জানুয়ারি আয়কর জমা দেওয়ার শেষ তারিখের পর সকল উপদেষ্টা গত বছর ও এই বছরের বিবরণ জমা দেবেন। তবে কবে নাগাদ তা প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ সম্পদ প্রকাশের আলোচনাকে আনুষ্ঠানিক নয় বরং অনানুষ্ঠানিক বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তথ্য প্রকাশ করা হবে।
শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, “এখনো প্রায় ২০ দিন সময় আছে। ইনশাআল্লাহ, এর মধ্যেই আমরা তথ্য প্রকাশ করব।”
তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, অন্তত একজন উপদেষ্টা—যিনি বেতন নেন না—তিনি সম্পদের বিবরণ জমা দেননি এবং তা প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি সেই উপদেষ্টার নাম জানাতে রাজি হননি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, তিনি কেবল মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য করার অনুমতি পেয়েছেন। সম্পদের বিবরণ সংক্রান্ত প্রশ্নের জন্য তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।


