তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির ভেতরে চলা অনিশ্চয়তা ও সাংগঠনিক স্থবিরতা কিছুটা কাটতে শুরু করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর। তবে দলের দীর্ঘদিনের নেতা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা।

এই দায়িত্ব এখন সরাসরি এসে পড়েছে দলের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাঁধে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের কাজ কেবল একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিএনপিকে আবারও একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজও তার হাতে। দলের অতীত অভিজ্ঞতা, ভুলত্রুটি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার স্পষ্ট মূল্যায়ন ছাড়া সে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলেই অভিমত তাদের।

দলীয় সূত্রগুলো স্বীকার করছে, বিএনপির ভেতরে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত আস্থার অভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে বিরোধ দীর্ঘদিনের। আসন্ন নির্বাচনে দল পরিচালনা এবং প্রার্থী বাছাই- দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে এসব বিভাজন।

যদিও তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তারপরও দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, এই গতি ধরে রাখতে হলে কঠোর সাংগঠনিক সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা জরুরি।

আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জয় এবং সরকার গঠনের সম্ভাবনাও দলের অতীত শাসনামলকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিএনপি ক্ষমতায় ফিরলে ঘুষ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

আগে ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে এমন সব অভিযোগ বিএনপির ভাবমূর্তিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এসব বিষয়ে ‍দৃঢ় অবস্থান ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে জনসমর্থন দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাদের মতে, দুর্নীতি বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে দলে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে বিষয়ে তারেক রহমানকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, বিএনপিকে আগে নিজেদের ভুলত্রুটি খোলাখুলিভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তার মতে, দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে রাজনীতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তার মতে, অতীতে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা ও কৌশলগত স্পষ্টতার অভাব ছিল। এই দুর্বলতাগুলো দূর না করা গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা পুনর্গঠন করা কঠিনই থাকবে।

কূটনৈতিক সম্পর্ক তারেক রহমানের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা দেশ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিএনপির অতীত সম্পর্ক নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এখন দলের প্রয়োজন আরও বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো, যেখানে একদিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বজায় থাকবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রতিহিংসাপরায়ণ ও সংঘাতমুখী রাজনীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জনসভা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি ঐক্য, পুনর্গঠন এবং দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন।

এই বার্তাকে কেউ কেউ ইতিবাচকভাবে দেখলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, কথার সঙ্গে বাস্তবতা মেলাতে হলে দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে হবে। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সমালোচনা মোকাবিলা, প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পরিমিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ- সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের প্রণয়ন করা আদর্শিক ভিত্তি থেকে অনেকটাই সরে গেছে বিএনপি। তার মতে, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সেই আদর্শিক শিকড়ে দলকে ফিরিয়ে আনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা ও দলাদলি সামাল দেওয়া।

মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এক ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান বলেন, মায়ের পথচলা এগিয়ে নিতে চান তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই আবেগঘন অঙ্গীকারকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখায় রূপ দেওয়াই হবে তার নেতৃত্বের শক্তি প্রমাণের মূল চাবিকাঠি।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা একমত যে, তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা দীর্ঘ। দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, দুর্নীতি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বিশ্বাসযোগ্য পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ বার্তা-সবই সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারলে তারেক রহমান কেবল বিএনপির নেতা হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে একজন জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad