ঢাকা ট্রাফিক: মামলা বাড়লেও কমেনি বিশৃঙ্খলা

ঢাকা ট্রাফিক: মামলা বাড়লেও কমেনি বিশৃঙ্খলা
ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর সড়ক মহাসড়কে আইন শৃঙ্খলা ফেরাতে ও জনজীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ভোগ কমাতে নিয়মিত ট্রাফিক আইনে মামলা করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। নিয়মিত মামলা করা হলেও কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না সড়কের বিশৃঙ্খলা যত্রতত্র পার্কিং, বিপরীত দিক থেকে যানবাহন চালানো, অটোরিকশার অনিয়ম। ডিএমপির পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলা করার পরও এর দৃশ্যমান সুফল নেই, ফলে প্রতিদিনই বাড়তি ভোগান্তিতে পড়ছে নগরবাসী।

২৫ দিনে ৩৮ হাজার ৬৬২ মামলা

চলতি বছরের প্রথম ২৫ দিনে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ১৯ দিন অভিযান চালিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৬৬২টি মামলা করেছে। গড়ে প্রতিদিন মামলা হয়েছে প্রায় সাড়ে পনেরোশ। তবে এ বিষয়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাসুম হাসান রাব্বি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ‘দুই মিনিটের জন্য মোটরসাইকেল রেখে খাবার কিনতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি অবৈধ পার্কিংয়ের মামলা দিয়েছে।’

আরেক গাড়িচালক ফায়েজ হাসান জানান, ‘জাহাঙ্গীর টাওয়ারের নিচে এটিএমে টাকা তুলতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি ট্রাফিক সার্জেন্ট মামলা দিচ্ছেন। এসব হয়রানির শেষ কোথায়?’

হয়রানির অভিযোগ মানতে নারাজ

তবে ‘মামলা দিয়ে জনগণকে হয়রানির’ অভিযোগ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তারা বলেন মামলা দিয়ে হয়রানি নয় বরং শৃঙ্খলা ফেরাতে বাধ্য হয়েই আইন অমান্যকারীদের মামলা দিচ্ছে পুলিশ।

ডিএমপির মতিঝিল ট্রাফিক ডিভিশনের ডিসি দেওয়ান জালালউদ্দীন টাইমসকে বলেন, ‘মামলা দিয়ে কাউকেই হয়রানি করা হচ্ছে না। কারণ তাদের আইন অমান্য করার ভিডিও প্রমাণ আমাদের কাছে থাকে। তারা চাইলে আমরা তাদেরকে সেই ফুটেজও দেখাই।’

ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদ টাইমসকে জানান, ‘সরকারের প্রজ্ঞাপনের পরে ভিডিও মামলা করা হচ্ছে। আগে ভিডিও মামলার প্রচলন ছিল না, তাই তদবির বা টাকার বিনিময়ে মামলা বাতিলের অভিযোগ ছিল। এখন সবকিছু ভিডিও প্রমাণের মাধ্যমে করা হয়।’

জনগণের আইন মানার অনিহা

রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন না মানার ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে। তাদের ট্রাফিক আইন অমান্য, এলোমেলো পার্কিং, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চালনা, মোটরসাইকেলের উচ্চগতি ও সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতার কারণেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর ফলে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনাও বাড়ছে।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সামনে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর লোকমান হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে নাগরিকদের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা খুব বেশি। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চালকদের। মোটরবাইক চালকরা সিগন্যাল মানতে চান না, আর অটোরিকশাগুলো মেইনরোডে উঠে আসে। গতবছর সরকার পতনের পরে অটোরিকশা চলার অনুমতি দেওয়া হলেও বলা হয়নি প্রধান সড়কে চলতে পারবে, এমন বিভ্রান্তিকর ঘোষণায় বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।’

লালবাগ ট্রাফিক এডমিন শফিউর রহমান বলেন, ‘সাধারণ মানুষ ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন নয়, আইন পড়ে না। কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে চান। অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। বাস–ট্রাকের ক্ষেত্রেও বাস যত্রতত্র দাঁড়ানোয় মামলার সংখ্যা বেশি।’

গুলশান অঞ্চলে দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর মো. দেলোয়ার হোসেন জানান ওই এলাকার মানুষ আইনের ব্যাপারে সচেতন হলেও গাড়ি পার্কিংয়ে অনিয়ম বেশি দেখা যায়। ‘নো–পার্কিং জোনে গাড়ি রাখলে ভিডিও করে মামলা দেই। তবে ৫ আগস্টের পর কিছু মানুষ অসহযোগিতা করছে।’

রামপুরা পুলিশ বক্সের ইন্সপেক্টর শাওন বলেন, ‘এখানে মালবাহী ট্রাকের চলাচল বেশি, অনেকেই লাইসেন্স ছাড়া চলে।ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা উল্টো পথে আসে, ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু সংখ্যায় এত বেশি যে সে তুলনায় আমাদের ফোর্স অপ্রতুল।’

আরও পড়ুন

রাজধানীর ৩০০ ফিটের কাঞ্চন ব্রিজে দ্বায়িত্বপালনকারী হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট হাশেম জানান, ওভারস্পিডে গাড়ি চালানো হলে মামলা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়াও গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, চালকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে অসামঞ্জস্যতা পেলে মামলা দিতে বলা হয়েছে ওপরমহল থেকে। এছাড়াও দৈনিক ২০টি গাড়িকে মামলার আওতায় আনার টার্গেট দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ট্রাফিক আইনে দণ্ড ও শাস্তি

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর একাদশ অধ্যায়ে ট্রাফিক আইন লংঘনের অপরাধ, বিচার ও দন্ডের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এ অধ্যায়ের ৬৬তম ধারাতে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত মোটরযান গণপরিবহন চালায় তাহলে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হবে। প্রয়োজনে উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

অধ্যায়ের ৭২ নম্বর ধারাতে বলা হয়েছে রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত কেউ যদি মোটরযান চালায় তবে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হবে।

এছাড়াও ৭৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীকে ৬ মাস থেকে ২ বছর অবধি কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ থেকে ৫ লাখ টাকা অর্থ জরিমানা গুনতে হতে পারে।

৭৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী মোটরযানের ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে সেই ব্যক্তিকে ৬ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হতে পারে।

এছাড়াও ৭৭ নম্বর ধারাতে বলা হয়েছে জনসমাগম হয় এমন যায়গাতে রুট পার্মিট ব্যতীত যানবাহন পরিচালনা করলে সেই ব্যক্তিকে ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

সড়কে চলাচলকারী পরিবহনের মধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা দেখা যায়। ট্রাফিক সিগন্যাল ও সাইন অমান্যকারী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে ৮৫ নম্বর ধারাতে বলা হয়েছে আইন অমান্যকারীকে ১ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হতে পারে।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালানো নিয়ন্ত্রণে ৮৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে উচ্চগতিতে গাড়ি চালালে চালকের ৩ মাসের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

হাইড্রোলিক হর্ন ও মোটরসাইকেলের হলার ব্যবহারে ৮৯ ধারা মোতাবেক ৩ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানো–নামানো বন্ধ করতে ৯০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে অপরাধী ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

ওভারলোড করে পরিবহন চালালে ৯৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী অপরাধী ব্যক্তিকে ৩ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হবে।

‘জরিমানার একটি অংশ পুলিশ পায়’

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে ট্রাফিক পুলিশ মামলার টাকার একটি অংশ পান বলে পুলিশ মামলা দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে দ্বায়িত্বরত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে টাইমস।

এমন দাবি ও ধারণাকে সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমূলক ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন ডিএমপির মতিঝিল ট্রাফিক ডিভিশনের ডিসি দেওয়ান জালালউদ্দীন। দেওয়ান টাইমসকে বলেন, ‘মামলা থেকে একপয়সাও কোন পুলিশ কর্মকর্তা পান না। যারা এমন দাবি করেছেন তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক। কারণ মামলার টাকা সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়।’

ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক ডিভিশনের ডিসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার অর্থ থেকে কোন অংশই কোন কর্মকর্তার পকেটে যায় না। পুরো টাকাটাই অনলাইন ব্যাংকিং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ফান্ডে জমা হয়। যারা এমন ধারণা পোষণ করছেন তারা ভ্রান্তির মধ্যে আছেন।’

নগর পরিকল্পনাবিদের মত

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের সাথে কথা হয় টাইমসের। ট্রাফিক মামলাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরেও কেন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ আইনকে ভয় পায় না। তারা জানে তাদের জন্য আইন নমনীয়। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। এ কারণে সাধারণ মানুষ আইন মানতে চায় না।’

সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরার জন্য ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতা বড় কারণ বলে মনে করেন এই নগরপরিকল্পনাবিদ।

সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে আদিল বলেন, ‘আমাদের আইনকে আরও কঠোর করতে হবে, যাতে প্রত্যেকটা নাগরিক আইন অমান্য করতে ভয় পায়। এছাড়া সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আইন কঠোরের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন ও মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে ‘

পুলিশ ডিজিটাল সফটওয়্যার জালিয়াতি করে মামলার টাকা আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘পুলিশ প্রকাশ্য দিবালোকে জালিয়াতি করে। যখন কোন ভুক্তভোগী মামলার টাকা জমা দিতে যায় তখন ডিজিটাল জালিয়াতি করে পুলিশ সেই অর্থের সিংহভাগ আত্মসাৎ করে যা দেশের রাজস্ব খাতে জমা হবার কথা ছিল।’

এর পেছনে বড় রাঘব বোয়ালরা জড়িত উল্লেখ করে তিনি আরও জানান এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে অভিযোগকারীকে হেনস্তা করে আড়ালে থাকা রাঘব বোয়ালরা।

যাত্রী, সাধারণ মানুষকে সতর্ক ও দ্বায়িত্বশীল হবার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব অর্গানকে দুর্নীতি মুক্ত করা না গেলে সড়কের এই বিশৃঙ্খলা কাটবে না বলেও মনে করেন তিনি।

অতিদ্রুত এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না করা হলে ঢাকা মহানগরীর সড়কের ভোগান্তি আরও চরমে উঠে নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে দেবে বলেও মত নগর পরিকল্পনাবিদের।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad