ঢাকার নিম্ন আদালত এলাকার চার হাজতখানায় প্রতিদিন আনা হয় ৫০০ জনের মতো আসামি। এরমধ্যে নতুন গ্রেপ্তার হয়ে আসা আসামিদের পাশাপাশি থাকেন কারাগার থেকে আনা আসামিরাও।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বিশাল পরিমাণ আসামি আনা-নেওয়া, আদালতে তোলার কাজে যে পরিমাণ পুলিশ প্রয়োজন তার সংকট রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সবমিলিয়ে নিম্ন আদালত এলাকায় ৫৪৫ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে হাজতখানায় আসামি আটক রাখা ও আনা-নেওয়া সংক্রান্ত কাজে কর্মরত পুলিশের সংখ্যা ২৫৭ জন। তবে ভিআইপি বা ঝুঁকিপূর্ণ আসামি আদালতে আনা হলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে মোতায়ন করা হয়।
হাজতখানাগুলোর মধ্যে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় ১৪৩ জন, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় ২৩ জন, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় ৬৭ জন এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় ২৪ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। তবে প্রায় সময় পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক আসামি ঢাকার আদালতে আসেন।
পুলিশ সঙ্কটের ফলে অধিকাংশ সময় দেখা গেছে, একজন পুলিশ সদস্য দুইজন করে আসামি নিয়ে আদালতে তুলছেন। এতে করে আসামিদের পলায়নের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে এমন ঘটনা। এছাড়াও আদালত এজলাসে মব ও সাংবাদিকদের ওপর আসামিপক্ষের আইনজীবীদের হেনস্তার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে।
তিন আসামির পলায়ন
গত ২২ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা এক মামলার আসামি রুবেল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ১০ম তলায় টয়লেটে যাওয়ার অজুহাতে পালিয়ে যান।
ব্যাপক অভিযান চালিয়েও তাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি ছিল চলতি বছরের তৃতীয় পলায়নের ঘটনা।
এর আগে, গত ১৯ জুন খিলগাঁও থানার জিসান হত্যা মামলার আসামি শরিফুল ইসলাম এক পুলিশ সদস্যকে আক্রমণ করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি শাহিদুল ইসলাম নামের আরও এক আসামি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এলাকা থেকে পলায়ন করে। পরে গত ১ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, এসব ঘটনার পেছনে জনবল ঘাটতি, অতিরিক্ত ভিড় এবং পুরনো নজরদারি ব্যবস্থা দায়ী। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলার শুনানির সময় সিএমএম আদালতে প্রায়ই বিশৃঙ্খল পরিবেশ দেখা যায়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আদালতে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
সাংবাদিকদের ওপর মব, বিশৃঙ্খলা, চুরি
৪ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্নার জামিন শুনানির সংবাদ কাভার করতে গেলে সময় টিভির এক সাংবাদিককে একদল আইনজীবী মারধর করে। পান্না সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হন।
এছাড়াও ২৮ অক্টোবর তিন সাংবাদিক ভিডিও ধারণ করতে গেলে আইনজীবীদের হাতে হয়রানির শিকার হন; পরে ভুক্তভোগী সাংবাদিকদেরই কাঠগড়ায় ডেকে জেলে পাঠানোর হুমকি দেন বিচারক।
অবশ্য সেসময় আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে মুক্তি পান সাংবাদিকরা।
এদিকে গত ৬ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতার এক মামলার শুনানি শেষে আইনজীবীদের মধ্যেই হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। গত ২৮ অক্টোবর মানিলন্ডারিং মামলার আসামি ও বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান খায়রুল বাশারকে আদালতে প্রবেশের সময় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা হামলা করে। পুলিশের উপস্থিতিতেও এ হামলা ঠেকানো যায়নি। এর আগে ১৫ জুলাইয়েও তার ওপর হামলা করা হয়েছিল।
এছাড়াও শেখ হাসিনার পতনের পর আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা দীপু মনি ও সাবের হোসেন চৌধুরীর ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।
এদিকে আদালতের ভেতরে-বাইরে প্রায়ই রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ভিড় করেন, অনেক সময় স্লোগান দেন। এর ফলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খল পরিবেশ। যদিও ২০০৫ সালে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী আদালত চত্বরে সমাবেশ, মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি নিষিদ্ধ।
গত ৯ অক্টোবর ঢাকা জজকোর্ট প্রাঙ্গণে মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের প্রাইভেট কারের যন্ত্রাংশ চুরি করার সময় মো. রোহান (১৯) নামে এক যুবককে হাতেনাতে আটক করা হয়। এরপর তাকে রাজধানীর কোতোয়ালী থানায় সোপর্দ করা হয়।
বিশেষ জজ আদালত ৪ এর ড্রাইভার মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘এর আগেই বিচারকদের পার্কিং স্থান থেকে একাধিকবার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। কয়েকবার চেষ্টা করেও তাদের ধরতে পারিনি। আজকে হাতেনাতে তাকে আটক করা হয়েছে।’
বর্তমানে সিএমএম ও জজ আদালত এলাকায় কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা আছে মাত্র ৪৮টি, যা বিশাল ও জনবহুল এই এলাকাটি নজরদারির জন্য যথেষ্ট নয়। বেশিরভাগ প্রবেশপথে নিরাপত্তা তল্লাশির যন্ত্রও নেই।
এদিকে আদালত এলাকার কিছু অংশ এখন ফেরিওয়ালা ও ভাসমান দোকানগুলোর দখলে। কিছু অংশতো পুরোপুরি বিক্ষোভস্থল ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে পরিণত হয়েছে। চুরি ও ছিনতাইও প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইনজীবী বলেন, ‘মাঝেমধ্যে ভিআইপি আসামিদের আনা হলে আদালত এলাকা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বহিরাগত ও ভাসমান মানুষ অবাধে চলাফেরা করে। এটা চলতে পারে না। সবার স্বার্থে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার।’
আদালত সূত্র জানায়, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী শুধুমাত্র ভিআইপি বা উচ্চঝুঁকির মামলায়ই মোতায়েন করা হয়। আদালতে কর্মরত সাংবাদিকরাও আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আসামি ও আদালতকর্মীদের নিরাপত্তা জোরদারে গত এক বছরে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এখন উচ্চঝুঁকির আসামিদের আদালতে আনার সময় ১০-১২ পুলিশ সদস্য ‘বক্স ফরমেশনে’ ঘিরে রাখেন, আর গেট থেকে আদালত পর্যন্ত ৪০-৫০ জন পুলিশ মানব প্রাচীর তৈরি করেন যাতে হামলা বা পালানোর আশঙ্কা না থাকে। আদালতের ভেতরও ৬-১০ জন পুলিশ আসামির পাশে অবস্থান করেন শুনানি শেষ হওয়া পর্যন্ত।
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিছু বহিরাগত আইনজীবীর পোশাক পরে আদালতে ঢুকে পড়েছিল, যেটা একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ হয়েছিল। এখন আমরা সবার পরিচয় যাচাই করছি যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত আইনজীবীরাই প্রবেশ করতে পারেন।’
এ বিষয়ে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন্ হাসান বলেন, ‘আগের কোনো ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে সম্পর্কে আমরা সজাগ আছি এবং যতজন জনবল আছে তাদের প্রতিদিন সকালে ব্রিফ করছি।’
তিনি যোগ করেন, ‘এছাড়াও সিনিয়র অফিসাররা আদালত প্রাঙ্গণ ঘুরেঘুরে তদারকি করছেন। কোনো কারণে ফোর্স বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সিনিয়র কর্তৃপক্ষ এ ব্যপারে সদয় আছেন।’


