ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দড়ি বেঁধে ধরে এনে ক্ষমতাচ্যুত করার সফল অভিযান এবং ইরান যুদ্ধের সূচনায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে এখন কিউবা।
সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ১৯৫৯ সাল থেকে কিউবা শাসন করা কমিউনিস্ট সরকার এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘ সাত দশকের প্রতিরোধের পর দেশটি এখন পরিবর্তনের জন্য ‘প্রস্তুত’ বলে তিনি মনে করেন। এই রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে আলোচনায় পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “তারা একটি সমঝোতা করতে চায়; তাই আমি মার্কোকে সেখানে পাঠাচ্ছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়।”
ভেনিজুয়েলা মডেলের পথে কিউবা
ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ক্ষেত্রেও সেই একই আইনি কৌশল নিচ্ছে, যা এর আগে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কার্যকর হয়েছিল। কিউবার সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার লক্ষ্যে মার্কিন বিচার বিভাগ এবং ট্রেজারি বিভাগ মিলে একটি বিশেষ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ তৈরি করেছে। ফ্লোরিডার সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নি অফিসের প্রধান জেসন রেডিং কুইনোনেস এই পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি তদারকি করছেন। মূলত অভিবাসন ও অর্থনৈতিক অনিয়মের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে তারা তদন্ত চালাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই আইনি পদক্ষেপগুলো কিউবার ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পথ তৈরি করবে।
পুরনো সংঘাত ও অমীমাংসিত ক্ষত
কিউবার বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানের পেছনে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা ও ঐতিহাসিক ক্ষোভ জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় নিবন্ধিত একটি স্পিডবোটে কিউবান সেনারা গুলি চালিয়ে একজন মার্কিন নাগরিকসহ পাঁচজনকে হত্যা করে। কিউবার দাবি তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ রুখতে গুলি চালিয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তা কুইনোনেস একে ‘অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী’ তথ্য বলে মন্তব্য করেছেন।
একই সাথে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ১৯৯৬ সালে ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামক সংগঠনের দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার দায়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিচার দাবি করছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডিকে লেখা এক চিঠিতে তারা এই ঘটনার জন্য সরাসরি রাউল কাস্ত্রোকে দায়ী করেন।
অর্থনৈতিক অবরোধ ও জ্বালানি সংকট
ট্রাম্প প্রশাসন কিউবাকে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়ে এক প্রকার কোণঠাসা করে ফেলেছে। গত জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় কিউবার জ্বালানি সরবরাহের প্রধান উৎসটি বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশটির দৈনন্দিন চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করত।
এর ওপর ট্রাম্পের নতুন নির্দেশ হলো—মেক্সিকোসহ যে দেশই কিউবাকে তেল দেবে, তাদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করা হবে। এই অবরোধের ফলে কিউবায় বিদ্যুৎ ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্পের ধারণা, এই অর্থনৈতিক চাপেই কিউবা সরকার ভেঙে পড়বে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার মনে হয় এটি এমনিতেই পড়ে যাবে। আলাদা কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই, এটি এখন পতনের অপেক্ষায়।”
অসম সামরিক শক্তি ও জনমনে শঙ্কা
মাদুরোর পতনের পর কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল সামরিক মহড়া বাড়ানোর নির্দেশ দিলেও বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। রয়্যাল মিলিটারি কলেজ অফ কানাডার অধ্যাপক হ্যাল ক্লেপাক জানান, কিউবার প্রায় সব সমরাস্ত্রই সেকেলে সোভিয়েত আমলের, যা মার্কিন সমরাস্ত্রের কাছে তুচ্ছ।
শক্তির এই বিশাল ব্যবধানের মাঝে কিউবার সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিউবার অনেকে বাকস্বাধীনতা হরণকারী শাসনের অবসান চায়। তবে দেশটির বেশিরভাগ মানুষের আশঙ্কা, সরাসরি সামরিক সংঘাত হলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। অবশ্য মার্কিন প্রশাসন আপাতত সরাসরি যুদ্ধের বদলে অর্থনৈতিক ও আইনি চাপ প্রয়োগ করেই কিউবার শাসন পরিবর্তনের কৌশলে স্থির রয়েছে।


