আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো স্পর্শকাতর মামলার বিচার। এই বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নথি, সাক্ষ্য, ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্তের নিরাপত্তা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানে এসব নথি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানকার কম্পিউটার ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিষয়টি কি কেবল একটি সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রশ্ন? নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি?
সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বক্তব্যের পর এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিচারকক্ষে দাঁড়িয়ে পলক দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালে ব্যবহৃত কম্পিউটারের উইন্ডোজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি লাইসেন্স ছাড়া উইন্ডোজ ব্যবহারের কথাও বলেন।
এরপর ট্রাইব্যুনাল থেকে পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকেও আইটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার কথা জানানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কি পাইরেটেড উইন্ডোজ ব্যবহৃত হচ্ছে? এ মুহূর্তে প্রকাশ্যে এমন কোনো প্রযুক্তিগত অডিট রিপোর্ট বা পরীক্ষার ফল নেই, যার ভিত্তিতে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ফলে পলকের বক্তব্যকে এখনো অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে। কিন্তু অভিযোগটি সত্য হলে তার গুরুত্ব অনেক বেশি।
একটি ‘ক্র্যাক’ থেকে কতটা ঝুঁকি?
পাইরেটেড সফটওয়্যার মানেই কম্পিউটার হ্যাক হয়ে গেছে, এমন ধারণা ভুল। কিন্তু অননুমোদিত সফটওয়্যার ব্যবহারের সঙ্গে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন উইন্ডোজ সক্রিয় করতে অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের অ্যাক্টিভেটর, ক্র্যাক বা পরিবর্তিত সিস্টেম ফাইল ব্যবহার করা হয়। এসব ফাইলের ভেতরে কী আছে, তা ব্যবহারকারীর পক্ষে যাচাই করা কঠিন। সেখানেই ঝুঁকি।
কোনো পরিবর্তিত ফাইলের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার ঢুকে যেতে পারে। তৈরি হতে পারে ব্যাকডোর। আক্রান্ত কম্পিউটার থেকে একই নেটওয়ার্কের অন্য ডিভাইসেও হামলা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আর যদি কম্পিউটারটি এমন কোনো নেটওয়ার্কের অংশ হয়, যেখানে সংবেদনশীল নথি আদান-প্রদান বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
শুধু তথ্য চুরি নয়, বদলে যাওয়ার আশঙ্কাও
সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু তথ্য চুরি নয়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার বা নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটলে তথ্য কপি করা, মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আক্রমণকারী দীর্ঘ সময় সিস্টেমের ভেতরে অবস্থান করেও থাকতে পারে, অথচ ব্যবহারকারী তা বুঝতে নাও পারেন।
বিচারিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। মামলার নথি, সাক্ষ্য, প্রমাণ, ব্যক্তিগত তথ্য বা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মতো তথ্য যদি অননুমোদিত কারও হাতে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এ কারণে প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু ‘উইন্ডোজের লাইসেন্স আছে কি না’ তা নয়।
নিরাপত্তা অডিট কোথায়?
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নিরাপদ কি না, তা অনুমান করে বলা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সাইবার নিরাপত্তা অডিট।
সেখানে পরীক্ষা করা দরকার ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেমের সংস্করণ ও লাইসেন্স, নিরাপত্তা আপডেটের অবস্থা, ইনস্টল করা সফটওয়্যার, অ্যান্টিভাইরাস ও অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক কনফিগারেশন, ব্যবহারকারীদের অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ এবং সিস্টেমে সন্দেহজনক কার্যক্রমের কোনো চিহ্ন আছে কি না।
এমনকি কোনো কম্পিউটারে পাইরেটেড উইন্ডোজ না থাকলেও সেটি নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই। পুরোনো সফটওয়্যার, দুর্বল পাসওয়ার্ড, ভুলভাবে কনফিগার করা নেটওয়ার্ক, অতিরিক্ত ব্যবহারকারী অধিকার কিংবা নিয়মিত ব্যাকআপের অভাবও বড় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই পলকের অভিযোগের সবচেয়ে কার্যকর জবাব রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা।
প্রশ্নটি এখন আরও বড়
পলক একসময় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এখন তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু অভিযোগের প্রযুক্তিগত দিকটি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ, অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে শুধু কেন পাইরেটেড উইন্ডোজ ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে নয়।
প্রশ্ন উঠবে, কারা এসব কম্পিউটার ব্যবস্থাপনা করেছেন? সফটওয়্যার ইনস্টল ও আপডেটের দায়িত্ব কার? নিরাপত্তা পরীক্ষা কত নিয়মিত হয়েছে? গুরুত্বপূর্ণ নথি কোথায় সংরক্ষিত হয়? সেগুলোর ব্যাকআপ আছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কোনো কম্পিউটারে আগে কখনো অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। পলকের দাবি সত্য, নাকি ভুল, সেটি নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় একটিই। স্বাধীন, পূর্ণাঙ্গ এবং প্রযুক্তিগতভাবে যাচাইযোগ্য একটি সাইবার নিরাপত্তা অডিট।
সেই পরীক্ষায় যদি দেখা যায় কম্পিউটারগুলো নিরাপদ, তাহলে অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে। আর যদি অনিরাপদ বা অননুমোদিত সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রমাণ মেলে, তাহলে সামনে আসবে আরও গুরুতর প্রশ্ন।
যে কম্পিউটারগুলোতে এত গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক তথ্য ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো এতদিন আসলে কতটা নিরাপদ ছিল?


