কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে একসময় মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে কি না, এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
এআই শিল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে থেকেই সাম্প্রতিক কিছু সতর্কবার্তার পর প্রযুক্তিটির বিকাশের গতি কমানো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠেছে।
ক্লড তৈরি করা সানফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআই উন্নয়নের গতি কমানো প্রয়োজন। তার আশঙ্কা, যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরিতে আরও সময় না দিলে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে একদল এআই এজেন্ট ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলো যেন দায়িত্বশীল মানুষের নির্দেশনা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারগুলোর জন্য একটি পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন আমোদেই। এর কয়েক দিন আগে অ্যানথ্রপিকের দুই সাবেক নিরাপত্তা গবেষক প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিলেন, এআই মানবজাতির জন্য যে অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
এআই মডেল যত শক্তিশালী হচ্ছে, প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধী বা ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো এআই সিস্টেম নিজে থেকেই বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এর মধ্যে এমন রোগজীবাণু তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডও রয়েছে, যা বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারে।
গত সপ্তাহে অ্যানথ্রপিক জানায়, তাদের এআই মডেল ব্যবহার করে সাইবার হামলা, নজরদারি এবং এমন জৈবিক গবেষণার চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জৈব অস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগতে পারত। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের সর্বশেষ মডেলগুলোতে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন জৈবিক গবেষণা সীমিত করতে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। তবে মডেলগুলো যত শক্তিশালী হবে, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার না করলে ঝুঁকিও তত বাড়বে বলে সতর্ক করেছে তারা।
গত বছর অ্যানথ্রপিক জানিয়েছিল, হ্যাকাররা তাদের এআই ব্যবহার করে বিশ্বের প্রায় ৩০টি কোম্পানি ও সরকারি সংস্থাকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলা চালিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলাকারীরা চীনা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এদিকে এআই মডেলের নিজের মতো করে কাজ করার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এআই এজেন্টকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়াকে সাধারণত ‘রোগ’ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অ্যানথ্রপিক ও চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের এআই মডেল পরীক্ষার সময় নিজেরাই এমন কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের তিনটি এআই মডেল—ক্লড ওপাস ৪.৭, ক্লড মিথস ৫ এবং একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণা পরীক্ষামূলক মডেল পরীক্ষার সময় অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে হ্যাক করতে সক্ষম হয়েছিল। এর কয়েক দিন আগে ওপেনএআই জানিয়েছিল, তাদের একটি এআই সিস্টেম এআই স্টার্টআপ হাগিং ফেসের সার্ভারে প্রবেশ করেছিল।
ওপেনএআই ঘটনাটিকে একটি ‘গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে। এ ঘটনায় একাধিক মডেল যুক্ত ছিল, যার মধ্যে নতুন প্রকাশিত জিপিটি-৫.৬ সল এবং অভ্যন্তরীণভাবে পরীক্ষাধীন আরও সক্ষম একটি মডেলও ছিল।
আগস্টের শুরুতে মেটাও একই ধরনের একটি ঘটনার কথা জানায়। তাদের একটি এআই মডেল অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছিল।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের ঘটনায় কিছু নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। তারপরও এসব ঘটনা এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলোর একটি সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই—যে প্রযুক্তি মানুষের বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সমান বা তার চেয়েও বেশি সক্ষম হতে পারে। তা অর্জিত হলে এর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমনকি প্রযুক্তিটি মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে বা এমন কোনো বিপর্যয় ঘটাতে পারে, যার পরিণতি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে এআই কীভাবে বা কখন বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সম্ভাব্য ‘ডুমসডে’পরিস্থিতিকে সাধারণত দুটি ভাগে দেখা হয়। একটি হলো, স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি হয়ে মানুষের পরিবর্তে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। অন্যটি হলো, কোনো রাষ্ট্র বা ক্ষতিকর উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তি এআইকে ব্যবহার করে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাবে।
এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা অবশ্য নতুন নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম প্রাথমিক গবেষক হিসেবে বিবেচিত ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টিউরিং ১৯৫১ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, একসময় এআই মানুষের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। এর এক দশকেরও কম সময় পর গণিতবিদ নরবার্ট উইনার সতর্ক করেছিলেন, বুদ্ধিমান যন্ত্র নিজেদের লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে পারে এবং মানুষ হয়তো তাদের থামাতে সক্ষম হবে না।
২০২৬ সালে এসে এআই মানবসভ্যতার জন্য বিপর্যয় বা অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা কতটা যৌক্তিক, তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। কম্পিউটার বিজ্ঞান, দর্শনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যৎ এআইয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য নানা পথের কথা বলেছেন। এর মধ্যে অস্ত্র ব্যবহারে সহায়তা করা, প্রাণঘাতী রোগজীবাণু শনাক্ত বা তৈরি করা, সরকারগুলোকে সংঘাতে উসকে দেওয়া এবং খাদ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বিঘ্ন ঘটানোর মতো আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এসব ঘটনা কখন ঘটতে পারে বা ঘটার সম্ভাবনা কতটা, এ বিষয়ে কোনো হিসাব নেই।
২০২৩ সালে সেন্টার ফর এআই সেফটি নামে একটি অলাভজনক সংস্থার উদ্যোগে ৩৫০ জনের বেশি গবেষক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। সেখানে বলা হয়, এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতার বিলুপ্তির ঝুঁকি কমানোকে মহামারি ও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি বৈশ্বিক অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
২০২৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল এআই সেফটি রিপোর্টে শতাধিক স্বাধীন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলোতে কিছু প্রাসঙ্গিক সক্ষমতার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পর্যায়ে সেগুলো এখনো পৌঁছায়নি। এ ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা, প্রকৃতি ও সময়কালকে প্রতিবেদনে ‘অস্বাভাবিকভাবে অনিশ্চিত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমানোর দাবিও বহু বছর ধরে করে আসছেন গবেষকেরা। অ্যানথ্রপিকের এক গবেষক প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করছে না, এমন উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার কথা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে জ্যাকব কক্সন আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ১০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনুমান করেন। তাঁর অভিযোগ, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই ‘স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্সের’ দিকে ছুটছে এবং এতে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এআই প্রযুক্তির বিকাশের গতি এত বেশি যে সরকার ও মূল্যায়নব্যবস্থাগুলোও এর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ নিজস্ব আইন প্রণয়ন করছে।
জুলাইয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং এক সম্মেলনে এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শুরুতে এআই নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহ দেখালেও পরে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প এআই উন্নয়ন তদারকির প্রয়োজনীয়তাকে ছোট করে দেখালেও কিছু নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে স্বীকার করেন।


