শরীরের ত্বকের ছোট্ট একটি নমুনা থেকেই তৈরি হচ্ছে মানব মস্তিষ্কের টিস্যু। অবিশ্বাস্য মনে হলেও গত কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় গবেষণাগারে ‘মিনি ব্রেন’ তৈরিতে সফল হয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গত কয়েক বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ত্বকের কোষ ও বিভিন্ন সংস্করণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষকরা দাবি করেছেন, সেগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পুনরায় এমন অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যেখান থেকে ত্বক ও রক্তকণিকা ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন ধরনের কোষ তৈরি হতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব কোষকে বলা হয় ‘প্ররোচিত বহুমুখী স্টেম কোষ’ (ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল-আইপিএসসিএস)। পরবর্তী ধাপে বিজ্ঞানীরা এগুলোকে স্নায়ুকোষ বা নিউরনে রূপান্তর করেন।
সঠিক পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় উপাদান পেলে এসব স্নায়ুকোষ নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হয়ে ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করতে পারে। এই কাঠামোকে বলা হয় মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র অঙ্গ বা ব্রেন অর্গানয়েড কিংবা মিনি ব্রেন।
প্রাণের জন্য স্নায়ুকোষ হলো মস্তিষ্কের মূল কার্যকরী কোষ। এগুলো বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই প্রক্রিয়াই মস্তিষ্ককে জীবের তথ্য বিশ্লেষণ, শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ এবং স্মৃতি সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে সাহায্য করে।
তবে গবেষণাগারে তৈরি মিনি ব্রেন বা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আসল মানুষের মস্তিষ্ক নয়। এগুলোতে পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের মতো জটিল গঠন বা জীবনযাপনের সংকেত ধারণের মতো সম্পূর্ণ সক্ষমতা নেই। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের কিছু বৈশিষ্ট্য এসব রূপান্তরিত কোষে পুনরায় তৈরি করা যায়। ফলে মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে তৈরি হয় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে কীভাবে এর কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এসব আইপিএসসিএস ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
মিনি ব্রেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো- এগুলো শুধু মস্তিষ্কের কোনো কৃত্রিম নকশা নয় বরং প্রকৃত জীবন্ত মানব কোষ থেকে তৈরি স্নায়বিক টিস্যু। নমুনার একক কোষে থাকা নিউরন (স্নায়ুকোষ) একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যোগাযোগ করতে পারে এবং কোষের ক্ষুদ্র কণা ইলেক্ট্রনও তৈরি করতে পারে।
কেন মিনি ব্রেন তৈরিতে ঝুঁকছেন বিজ্ঞানীরা?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণাগারে কৃত্রিম ‘জীবন্ত’ মানব অঙ্গ সৃষ্টির চেষ্টার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো রোগ গবেষণা। যেসব বিষয় সরাসরি জীবন্ত মানুষের মস্তিষ্কে পরীক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন, বিজ্ঞানীরা মানুষের কোষ থেকে তৈরি এসব ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বিকাশ এবং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন।
এরইমধ্যে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যা ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণায় এসব মডেল ব্যবহার করতে শুরু করেছেন গবেষকরা। সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতির ট্রায়ালের (পরীক্ষা) ক্ষেত্রেও এগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে ওষুধ পরীক্ষা
কোনো নতুন ওষুধ মানবদেহে কার্যকারিতা পরীক্ষার আগে নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত প্রাণীর দেহে প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে ইঁদুর, বানরের মতো প্রায়ই নানা প্রাণীকে ‘চিকিৎসা গিনিপিগ’ হিসেবে গবেষণাগারে রাখেন বিজ্ঞানীরা। তবে কোনো ওষুধ এসব নমুনা প্রাণীর শরীরে কার্যকর হলেই যে তা মানুষের শরীরেও একইভাবে কাজ করবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কাজেই মানবদেহে নতুন কোনো ওষুধ কাজ করবে কিনা তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা হতে পারে কেবল মানুষের কোষ থেকে তৈরি কৃত্রিম অঙ্গে কার্যকারিতা প্রমাণ। মিনি ব্রেন গবেষকদের এমন একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, যার মাধ্যমে মানব স্নায়বিক টিস্যুতে ওষুধের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা যায়।
রাতারাতি প্রাণীর ওপর গবেষণা বন্ধ করা এর উদ্দেশ্য নয়, বরং মানুষের শরীরের সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতি তৈরি করা এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রাণীর দেহে পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাও মানবভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি আরও নির্ভরযোগ্য ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য মিনি বডি পার্টস (ক্ষুদ্র অঙ্গ) মডেল তৈরির জন্য আট কোটি ৭০ লাখ ডলারের একটি নতুন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। শুরুতে কেন্দ্রটি যকৃত, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ও অন্ত্র নিয়ে কাজ করছে, তবে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের মডেল নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে সংস্থাটি মানবদেহের কার্যক্রম আরও ভালোভাবে অনুকরণ করতে পারে- এমন গবেষণা পদ্ধতি তৈরি ও সম্প্রসারণের জন্য ১৫ কোটির বেশি ডলারের আরেকটি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কগুলো যা করছে
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরেও এই গবেষণার আরেকটি বিস্ময়কর দিক রয়েছে। মিনি ব্রেনের ভেতরে স্নায়ুকোষ তৈরি হওয়ার পর তারা একে অপরের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে এবং ইলেক্ট্রন প্রবাহিত সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে।
গবেষকরা কোষগুলোর এই স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারেন এবং বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে দিয়ে স্নায়ুকোষকে উদ্দীপিতও করতে পারেন।
তবে এই সক্ষমতার অর্থ এই নয়- ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক পূর্ণ ক্ষমতায় চিন্তা করছে কিংবা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে। বরং এর অর্থ হলো, এই ছোট ছোট মানব স্নায়বিক টিস্যু এমন কিছু মৌলিক কার্যক্রম দেখাচ্ছে, যা আমরা সাধারণত কার্যকর মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানি।
স্নায়ুকোষগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, সংকেত আদান-প্রদান করে এবং গবেষকদের উদ্দীপনায় প্রতিক্রিয়া দেখায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব নেটওয়ার্ক আরও সংগঠিত কার্যক্রমের ধরণ তৈরি করতে পারে।
সহজ ভাষায়, বিজ্ঞানীরা শুধু কিছু মানব কোষ তৈরি করছেন না; তারা জীবন্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন এবং বাস্তব সময়ে তা কীভাবে বিকশিত হয় ও প্রতিক্রিয়া জানায়, তা পর্যবেক্ষণ করছেন।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। যদি জীবন্ত স্নায়ুকোষ তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে কি তারা মানব শিশুর মতো ধীরে ধীরে শিখতেও পারে?
পং খেলতে শেখানো হলো স্নায়ুকোষকে
মিনি ব্রেনকে প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা হিসেবে ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কর্টিক্যাল ল্যাবসের গবেষকরা একটি চমকপ্রদ পরীক্ষা চালান। তারা মানুষের ও ইঁদুরের জীবন্ত স্নায়ুকোষকে বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত একটি যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং জনপ্রিয় ভিডিও গেম পং-এর একটি কৃত্রিম সংস্করণ খেলানোর চেষ্টা করেন।
সে সময় প্রশ্ন ছিল, জীবন্ত মস্তিষ্কের কোষকে কি প্রকৃতপক্ষে কোনো খেলা শেখানো সম্ভব?
এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয় ডিশব্রেইন। এতে খেলার ভেতরে কী ঘটছে, সেই তথ্য বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে স্নায়ুকোষে পাঠানো হয়। এরপর স্নায়ুকোষ নিজেদের সংকেত তৈরি করে প্রতিক্রিয়া জানায়।
যখন ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করত, তখন স্নায়ুকোষগুলো নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিক্রিয়া পেত। ভুল হলে তারা ভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খল সংকেত পেত।
গবেষকরা জানান, পরীক্ষার সময় স্নায়ুকোষের তৈরি নেটওয়ার্কের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়েছিল। গবেষণায় একে লক্ষ্যনির্ভর কার্যক্রম (গোল ডিরেক্টেড এক্টিভিটি) এবং ‘কৃত্রিম জৈবিক বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
অর্থাৎ, গবেষণাগারে থাকা জীবন্ত মানব স্নায়ুকোষকে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে পং খেলানো হয়েছিল।
তবে এখানে মানব মস্তিষ্ক ও ল্যাবে তৈরি ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
মিনি ব্রেন শুধু কোনো পাত্রের ভেতরে রাখা ছোট্ট মানুষের মস্তিষ্ক ছিল না, যা সচেতনভাবে ভিডিও গেম খেলছিল। এই পরীক্ষায় ডিশব্রেইনে ব্যবহার করা হয়েছিল বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত একটি স্তরে বেড়ে ওঠা স্নায়ুকোষ। এটি পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়, বরং একটি জীবন্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্ক।
বিজ্ঞান সাময়িকী নিউরন তখন জানিয়েছিল, কয়েক লাখ মানব স্নায়ুকোষকে বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত পাত্রে রেখে পং-এর একটি সংস্করণ খেলতে শেখানো হয়েছিল।
এই পরীক্ষা দেখিয়েছে, জীবন্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তথ্য ও প্রতিক্রিয়াসমৃদ্ধ পরিবেশে যুক্ত হলে নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে।
এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক কি সচেতন?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো- বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন।
কোনো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের দিকে তাকিয়ে সেটি সচেতন কি না, তা নির্ধারণ করার মতো সহজ ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো পরীক্ষা এখনো নেই।
বৈদ্যুতিক কার্যক্রম থাকা মানেই সচেতনতা নয়। কোনো উদ্দীপনায় প্রতিক্রিয়া দেখানোও চেতনার প্রমাণ নয়।
এমনকি কোনো স্নায়বিক নেটওয়ার্ক সহজ কোনো কাজ শিখতে পারলেও তা প্রমাণ করে না যে সেটি কোনো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা লাভ করছে।
বিষয়টি এখনো বিজ্ঞানী ও নীতিবিদদের মধ্যে সক্রিয় বিতর্কের বিষয়। ২০২৪ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্সে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের চেতনা, নৈতিক মর্যাদা, দাতার সম্মতি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এখানেই বিজ্ঞান দর্শনের সঙ্গে মিলিত হয়। যদি কোনো দিন কোনো ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে তার কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তাহলে আমরা কীভাবে তা বুঝব?
বর্তমানে সেই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।
যদি ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আরও বড় হয় তখন?
মানুষের মস্তিষ্কের মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কেও পূর্ণাঙ্গ রক্তনালি ব্যবস্থা নেই। ফলে বড় আকারের কাঠামোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে গবেষকরা এমন পদ্ধতি খুঁজছেন, যাতে এসব কাঠামোর মধ্যে রক্তনালির মতো ব্যবস্থা তৈরি করা যায় এবং এগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় জীবিত রাখা সম্ভব হয়।
যতই এসব ব্যবস্থা উন্নত হবে, ততই নৈতিক প্রশ্নগুলো কঠিন হয়ে উঠবে।
সীমিত কার্যক্রম থাকা কয়েকটি স্নায়ুকোষের গুচ্ছ এক বিষয়। কিন্তু যদি বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আরও বড়, পরিণত ও উন্নত সংযোগযুক্ত মানব স্নায়বিক টিস্যু তৈরি করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে- কোন পর্যায়ে সেটি বিশেষ সুরক্ষার দাবি করতে পারে?
এটি আর কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়। গবেষক ও জীববিজ্ঞান নীতিবিদরা এরইমধ্যে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের নৈতিক মর্যাদা, দাতার সম্মতি, ব্যক্তিগত তথ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছেন।
আপনার দেহের কোষ দিয়ে তৈরি কোনো কাঠামোর ওপর অধিকার কার?
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নেচার সাময়িকীর একটি মন্তব্যে সতর্ক করা হয়, যারা চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার জন্য নিজেদের টিস্যু দান করেন, তারা হয়তো জানেন না যে ভবিষ্যতে তাদের কোষ জীবন্ত জৈব কম্পিউটার তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে।
অর্থাৎ বিতর্ক শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয় যে গবেষণাগারে তৈরি মস্তিষ্কের কোনো অধিকার থাকা উচিত কি না।
প্রশ্ন উঠছে, যে ব্যক্তির কোষ থেকে এটি তৈরি হয়েছে, সেই ব্যক্তির কি ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা কী তৈরি করবেন- সে বিষয়ে কোনো অধিকার থাকবে?
এখানেই বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনাতে শুরু করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জীবন্ত স্নায়ুকোষের মেলবন্ধন
প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত যন্ত্র, সফটওয়্যার ও কৃত্রিম স্নায়বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষের বুদ্ধিমত্তার কিছু দিক অনুকরণ করে।
কিন্তু এখন একদল গবেষক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অনুসন্ধান করছেন- জীবন্ত মানব স্নায়বিক টিস্যুকেই কম্পিউটারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না। এই নতুন ক্ষেত্রকে বলা হচ্ছে অর্গানয়েড বুদ্ধিমত্তা (অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স)।
২০২৩ সালে ফ্রন্টিয়ার্সে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, অর্গানয়েড বুদ্ধিমত্তা হলো এমন একটি উদীয়মান ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ককে এমন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা জীবন্ত স্নায়বিক টিস্যুতে তথ্য পাঠাতে ও সেখান থেকে তথ্য নিতে পারে।
প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জীবন্ত টিস্যু দিয়ে প্রতিস্থাপন করার পরিবর্তে জীবন্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে নতুন ধরনের কম্পিউটিং ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে কি না, তা অনুসন্ধান করাই এর লক্ষ্য।
গবেষকরা এরইমধ্যে এমন ব্যবস্থা তৈরি করছেন
কর্টিক্যাল ল্যাবস সিএলওয়ান নামে একটি জৈব কম্পিউটার তৈরি করেছে, যা জীবন্ত স্নায়ুকোষকে কম্পিউটিংয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তৈরি। এই ব্যবস্থায় জীবন্ত স্নায়ুকোষকে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ও সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি ডুম নামের জনপ্রিয় প্রথম ‘হিউম্যান শুটিং’ গেমও সিএলওয়ান ব্যবস্থায় চালানো হচ্ছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ কল্পনার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণাগারে তৈরি মানব মস্তিষ্ক দিয়ে চালিত কোনো মানবসদৃশ রোবট তৈরি করেননি। তারা কোনো সচেতন যন্ত্রও তৈরি করেননি।
তারা যা করেছেন, তা হলো- জীবন্ত স্নায়ুকোষকে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন যে এসব কোষ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে এবং সীমিত কিছু কাজ করতে পারে।
বড় প্রশ্ন হলো, জীবন্ত স্নায়বিক টিস্যু কি ভবিষ্যতে কার্যকর নতুন ধরনের কম্পিউটিং ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারবে?
জৈব কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করা গবেষকরা মনে করেন, জীবন্ত স্নায়বিক ব্যবস্থা কম তথ্য থেকেও শেখা এবং মানিয়ে নেওয়ার মতো কিছু বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।
তবে এটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা। বর্তমান ব্যবস্থাগুলো মানুষের মস্তিষ্কের নমনীয়তা ও জটিলতার কাছাকাছিও নয়।
গবেষণাগারে তৈরি মানব মস্তিষ্ক নিয়ে হাঁটতে থাকা কোনো রোবট এখনো ভবিষ্যতের বিষয়।
তবে এর ভিত্তি তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে, তখন জীববিজ্ঞানীরা একই সময়ে গবেষণাগারের ছোট পাত্রে বুদ্ধিমত্তার কাঁচামাল-জীবন্ত স্নায়ুকোষ তৈরি করছেন।
এভাবে সচেতন যন্ত্র তৈরি করা থেকে বিজ্ঞান এখনো অনেক দূরে। কিন্তু প্রথমবারের মতো প্রশ্নটি আর কেবল কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সূত্র: এনডিটিভি


