বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ আশেপাশের এলাকায় হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার পরও শিশুদের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক শিশুর অভিভাবক জানান, আগে শিশুরা সুস্থ থাকলেও, টিকা নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দিয়েছে। এরইমধ্যে আক্রান্ত কয়েক শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা জানিয়েছেন, টিকা নেওয়ার কারণে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়নি। সাধারণত শরীরে হামের ভাইরাস ঢুকলে উপসর্গ প্রকাশ পেতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে।
‘অর্থাৎ, টিকা দেওয়ার আগেই হয়তো ওই শিশুদের দেশে ভাইরাস ঢুকে গেছে। কাজেই টিকা পাওয়ার পরও হয়তো সেই রোগী হামে আক্রান্ত হয়েছে। টিকার কারণে কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হয়নি’, বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজসহ নগরের একাধিক বেসরকারি হাসপাতালে হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে চট্টগ্রামে শুধুমাত্র হাম শনাক্তের জন্য কোন টেস্ট করার ব্যবস্থা চালু নেই।
এক্ষেত্রে ঢাকার আইসিডিডিআরবিই একমাত্র ভরসা। বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালে হাম শনাক্তের পরীক্ষা চালুর কথা বলা হলেও কিট সংকট এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই সেখানে টেস্ট করাতে পারছে না।
চমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ৯৭ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছে আরও ৩৭ জন। এর মধ্যে ১৫ শিশুকে রাখা হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ)।
গত ২৪ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। ভর্তি হওয়া শিশুদের অধিকাংশের বয়স দেড় বছরের কম বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে টিকা কার্যক্রম চলমান থাকার পরও চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৭৯ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫৫ জন। এখন পর্যন্ত মোট ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার ৩০ জন।
বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আছেন ২৪৯ জন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১১৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ জনে, যার মধ্যে একজনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছিল। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মোট ৯০০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৮৫ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। এর মধ্যে ১০ মে পর্যন্ত প্রায় ৯২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। এ ছাড়া সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ১৫ উপজেলায় এখন পর্যন্ত দুই লাখ ৯০ হাজার শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৩ হাজার। আগামী ২০ মে পর্যন্ত এসব উপজেলায় টিকা কর্মসূচি চলবে।
টিকা পাওয়ার পরও শিশুরা হামে আক্রান্ত হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া এলাকার বাসিন্দা শিমুল শীল জানান, তার ১০ মাস বয়সী মেয়ে শ্রাবনীশি গত ৩ মে হাম প্রতিরোধী টিকা পায়। শিশুটির মা শিল্পী শীল জানান, টিকা নেওয়ার আগে তার মেয়ের কোনো অসুস্থতা ছিল না। তবে কয়েকদিন পর জ্বর, সর্দি ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকরা হাম শনাক্ত করেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কক্সবাজারের চকরিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হানিফ। তার ১৭ মাস বয়সী মেয়ে রামিশা এবং তিন বছর বয়সী ওয়ারিয়া গত ২৮ এপ্রিল হাম প্রতিরোধী টিকা নেয়। চমেক হাসপাতালে শিশুদের দাদা জানান, টিকা নেওয়ার আগে শিশুদের শরীরে কোনো উপসর্গ ছিল না। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে জ্বর, কাশি ও সর্দি শুরু হয়। পরে ৫ মে চকরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ৮ মে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।
কেবল তিন মাস ২২ দিন বয়সী আরিয়ান ইসলাম নামের আরেক শিশুও দীর্ঘদিন ধরে চমেকে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার বাবা মোহাম্মদ আবির জানান, গত ২২ দিন ধরে শিশুটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। পিআইসিইউতে নেওয়ার চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হচ্ছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। টিকা নেওয়ার পরপরই কেউ আক্রান্ত হলে সেটিকে সরাসরি টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার আগেই শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করে থাকতে পারে, কিন্তু উপসর্গ পরে প্রকাশ পায়। আবার টিকা নেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতেও কিছুটা সময় লাগে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাম আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ার তিন থেকে চার দিন আগেই সংক্রমণ ঘটে। যেমন, আজ কোনো শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে ধরে নিতে হবে, সে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার সংক্রমিত হয়েছে। সাধারণত এই র্যাশ শিশুর শরীরে ৬ থেকে ৭ দিন থাকে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো শিশু অন্য কোনো অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালে যদি হাম আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসে, তাহলে পরবর্তীতে সে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেলেও ওই সংস্পর্শের কারণে তার শরীরে হাম সংক্রমণ হতে পারে। আবার টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসার কারণে অন্য শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।’
সোমবার বিকাল তিনটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশুদের চাপ সবচেয়ে বেশি। ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি বেডেই দুই থেকে তিনজন করে শিশুকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
হাসপাতালের দুই তলার শিশু ওয়ার্ডের হাম ব্লকে রাখা হয়েছে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত শিশুদের। সেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা কক্ষে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জায়গার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
ওয়ার্ডজুড়ে ছিল গরম আর ভ্যাপসা পরিবেশ। অসুস্থ শিশুদের কান্না, কাশি আর স্বজনদের উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক শিশুকে মায়ের কোলে ছটফট করতে দেখা যায়। কয়েকজন স্বজন হাতপাখা দিয়ে শিশুদের বাতাস করছিলেন।
চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকরা জানান, টিকা দেওয়ার পরও হঠাৎ করেই জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আর চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নতুন কনসাইনমেন্টের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৬ মে হাম, মাম্পস, রুবেলা ও ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনসহ ১০ ধরনের টিকার একটি চালান দেশে পৌঁছেছে। সাধারণত ইউনিসেফ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে এই টিকাগুলো বাংলাদেশে আনা হয়।


