চারিদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত আর ফসলি জমি। মাথার ওপর তপ্ত রোদ। ঠিক এর মাঝখানেই যেন এক জাদুর কাঠি ছোঁওয়া শীতল দ্বীপ— ঝিনাইদহ সদর উপজেলার জামতলা পুকুর পাড়। আর এই দ্বীপের মূল নায়ক প্রায় দেড়শ বছরের এক বুড়ো বটগাছ। ডালপালা মেলে সে যেন পরম মমতায় আগলে রেখেছে পাখির আশ্রয়।
আশেপাশের মাঠে যেখানে একটুখানি ছায়ার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে এই প্রাচীন বটগাছটি হয়ে উঠেছে শত শত বন্যপ্রাণীর নিরাপদ ঠিকানা। কাঠবিড়ালির লুকোচুরি থেকে শুরু করে গাছের গোড়ায় শেয়ালের হুটোপুটি— কী নেই এখানে! ভোরের আলো ফুটতেই এই গাছে শুরু হয় রঙের মেলা আর সুরের জলসা। টিয়া, ঘুঘু, কোকিল, বুলবুলি, শালিক আর মৌটুসি পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে পুরো এলাকা। গোধূলির আলো নেভার আগে পর্যন্ত চলে তাদের এই আনন্দোৎসব। দেখে মনে হবে, কোনো এক নিপুণ শিল্পী পরম যত্নে তৈরি করেছেন এই প্রাকৃতিক পাখিরালয়।
গাছের ফল সারা বছরই দেশি আর পরিযায়ী পাখিদের লোভ দেখায়। আর এই অতিথিদের ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ, নাম তার রবিউল ইসলাম। পুকুরের এই দীর্ঘদিনের পাহারাদার গাছটির পাশেই একটি অস্থায়ী ঘরে থাকেন। প্রতিদিন নিয়ম করে পাখিদের খাবার দেন তিনি। কিছুদিন আগে এক মা শেয়াল এই গাছের শিকড়ের আড়ালে পরম নিশ্চিন্তে জন্ম দিয়েছে ফুটফুটে কয়েকটি ছানা।
তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে বাবুই পাখিরা। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর এবারই প্রথম পাশের তালগাছগুলো মুখর হয়েছে বাবুই পাখির চিরচেনা কিচিরমিচিরে। যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো চেনা বন্ধু অনেক বছর পর ঘরে ফিরেছে!
মহারাজপুর ও হরিপুর— এই দুই গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জামতলা পুকুর। প্রায় ৪৩০ শতাংশ জলভাগ আর চারপাশের চারণভূমিসহ মোট ৭৫০ শতাংশের এই বিশাল চত্বরে এই বটগাছ একা নয়। তাকে সঙ্গ দিতে চারপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে খেজুর, তাল, মেহগনি আর কলাগাছ। এগুলোও পাখিদের বাড়তি আবাসন সংকট দূর করেছে।
এলাকার ৬৩ বছর বয়সী প্রবীণ হারুন অর রশিদ স্মৃতির পাতা হাতড়ে বলেন, “আমি যখন দশ বছরের শিশু, তখনও এই গাছটাকে এমনই বিশাল দেখতাম। সময়ের নিয়মে কিছু ডালপালা হয়তো ভেঙে পড়েছে, কিন্তু তার মহিমা কমেনি।”
শুধু প্রকৃতির আশ্রয়ই নয়, গাছটি জড়িয়ে আছে মানুষের বিশ্বাসের সাথেও। যুগের পর যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই গাছের নিচে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন, যা আজও সমানভাবে চলছে।
প্রকৃতির এই রূপ দেখে স্থানীয় বাসিন্দা জিয়ারুল মন্ডল বলেন, “মানুষ যদি প্রকৃতির কাজে বাধা না দেয়, তবে প্রকৃতি নিজেকে কত সুন্দর করে সাজাতে পারে, এই গাছটি তার প্রমাণ। তপ্ত দুপুরে মাঠের শ্রমিকরা এর ছায়ায় এসে প্রাণ জুড়ান, আর বন্য পাখিরা পায় প্রাণের স্পন্দন।”
পুকুরটি মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস। তিনি জানান, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এখানে কঠোরভাবে পাখি শিকার বন্ধ রাখা হয়েছে। আর এই নিরাপত্তার কারণেই দিন দিন পাখির সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে।
জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর পর বাবুই পাখির এই ফিরে আসা প্রকৃতির জন্য এক দারুণ সুসংবাদ। যদি এই আবাসস্থল এভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তবে পাখিদের সংখ্যা আরও বাড়বে।
কৃত্রিমতার এই যুগে ঝিনাইদহের এই জামতলা কেবল একটি পুকুর পাড় নয়, এটি মানুষের ভালোবাসা আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এক টুকরো স্বর্গ। আগামী প্রজন্মের জন্য এই অনন্য পাখিরালয়কে বাঁচিয়ে রাখা এখন আমাদের সবার দায়িত্ব।


