১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল। তৎকালীন আমাদের রাজনৈতিক আকাশ তখন উত্তাল। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মুক্তি পায় জহির রায়হানের অনন্য সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার নেশায় মত্ত এক জাতির সামনে এই চলচ্চিত্রটি নিছক বিনোদন হিসেবে নয়, বরং প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
সিনেমার শুরুতে একটি স্লোগান ছিল— ‘একটি দেশ, একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন, একটি চলচ্চিত্র’। জহির রায়হান অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে একটি সাধারণ পরিবারের গল্পের আড়ালে একটি রাষ্ট্রের শোষণের চিত্র তুলে ধরেছেন। সিনেমার প্রধান চরিত্র বড় বোন রওশন জামিল ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বা ইয়াহইয়া খানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বাড়ির সব ক্ষমতা তার হাতে কুক্ষিগত, যার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তার কোমরে ঝোলানো চাবির গোছা। তার একনায়কতান্ত্রিক আচরণ, পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্যাতন এবং বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতি মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণেরই চিত্রায়ন। অন্যদিকে, আনোয়ার হোসেনের চরিত্রটি ছিল একজন দেশপ্রেমিক ও সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতার, আর রাজ্জাক প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন প্রতিবাদী ছাত্রসমাজের।
শুটিং চলাকালীন সময়ে জহির রায়হানকে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল। অভিনেত্রী সুচন্দা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, জহির রায়হান এমন একটি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন যা পুরো পাকিস্তানকে নাড়িয়ে দেবে। এমনকি শুটিং চলাকালীন একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেটে চলে আসে এবং জহির রায়হানকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তিনি সেনাদের সরাসরি বলেছিলেন যে, সেন্সর বোর্ড ঠিক করবে সিনেমা মুক্তি পাবে কি না, কিন্তু সেনারা শুটিং আটকাতে পারে না। তৎকালীন সামরিক আইন প্রশাসক রাও ফরমান আলী ১১ মার্চ ১৯৭০ সালে এই সিনেমার নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি জহির রায়হানকে বিষ প্রয়োগে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
এ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন খান আতাউর রহমান। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান প্রচার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও জহির রায়হান সাহসের সাথে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি সিনেমায় ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি প্রথমবারের মতো কোনো সিনেমায় চিত্রায়িত হয়, যা একুশের চেতনাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ এবং ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ গানগুলো অবরুদ্ধ বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল।
পাকিস্তানি সামরিক সরকার সেন্সরের সময়ও ছবিটি আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রবল চাপের মুখে এবং বিভিন্ন সিনেমা হলে দর্শকদের বিক্ষোভের কারণে সেন্সর বোর্ড শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়।
মুক্তি পাওয়ার প্রথম দিনই সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ প্রথম দিনই এর প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করে সিনেমার রিল জব্দ করে নিয়ে যায়। এর প্রতিবাদে ঢাকার গুলিস্তান হলের সামনে শত শত দর্শক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরবর্তীতে পুনরায় প্রদর্শনের অনুমতি মিললেও পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী জহির রায়হানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, “ছবিটি ছেড়ে দিলাম, তবে আমি তোমাকে দেখে নেব।”
সিনেমাটির শেষে রওশন জামিলের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং পরিবারের সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়। সিনেমার শেষে একটি কন্যা শিশুর জন্ম হয়, যার নাম রাখা হয় ‘মুক্তি’। এই ‘মুক্তি’ নামটি ছিল পরাধীন বাংলার আসন্ন স্বাধীনতার এক স্পষ্ট ইঙ্গিত। সিনেমার শেষে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের যে দৃশ্যটি দেখা যায়, সেটি ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বাস্তব প্রভাতফেরি থেকে নেওয়া হয়েছিল।
‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তির পর টানা ২৫ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল। কালজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এই সিনেমাটি দেখার পর জহির রায়হান সম্পর্কে বলেছিলেন, “ছেলেটি এখনো ঢাকায় পড়ে আছে কেন? ওর জায়গা তো অনেক উপরে।” জহির রায়হানের দেশপ্রেমের প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি সিনেমা প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।


