অমিতাভ রেজা চৌধুরীর পরিচালনায় নির্মিত হয়েছিল ‘আয়নাবাজি’। ছবিটি ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিল। ওই সময়ে রেকর্ড ব্যবসা করেছিলো। বক্স অফিস ছবিটি দিয়ে পেইজ থ্রিতে যুক্ত হলো ‘টাইমস ব্লকবাস্টার’।
‘আয়নাবাজি’ শুধু একটি চলচ্চিত্রই ছিলো না, ছিলো আয়নার ভেতর লুকানো শহরের প্রতিচ্ছবি। যে আয়না আমাদের শহরকে দেখিয়েছে নতুন চোখে, আর আমাদের নিজস্ব মুখোশ খুলে দিয়েছে নিঃশব্দে।
ছবিটি মুক্তির আগে ট্রেলারেই বাজিমাত করেছিলো। প্রচারণায় দেখা গিয়েছে অভিনবত্ব। ছবির অভিনয়শিল্পী চঞ্চল চৌধুরীসহ অন্যান্যরা ছুটে গিয়েছেন ক্রিকেট মাঠে। ‘আয়না’ চরিত্রের লুক নিয়ে ম্যাচের ফাঁকে প্রচারণা দর্শকদের দারুণ প্রভাবিত করেছিল। ফলাফল মুক্তির আগে স্টার সিনেপ্লেক্সে রেকর্ড শো। ঢাকাসহ দেশের সকল বড় সিনেমা হলে শুক্রবার সকালের শো থেকেই উপচে পড়া ভিড়।
গল্পের আয়না এক রহস্যময় মানুষ— যে অন্যের জীবন যাপন করে, অন্যের ভাগ্য নিজের শরীরে বয়ে বেড়ায়। প্রতিবার তার পরিচয় বদলায়, প্রতিবার সে হয়ে ওঠে অন্য কেউ। অথচ তার নিজের নাম, নিজের অস্তিত্ব আড়ালেই থেকে যায়। গল্পের এই অভিনব রূপই দর্শককে টেনে নিয়েছিলো প্রথম মুহূর্ত থেকেই।
প্রধান চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় ছিলো যেনো নিখুঁত মায়াজাল। তিনি ভেঙেছেন অভিনয়ের সব প্রচলিত সীমানা। কখনো তিনি দুর্বল, কখনো শক্তিমান, কখনো অপরাধী, আবার কখনো প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া সরল মানুষ। প্রতিটি রূপে তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য, যেনো সত্যিই এমন একজন মানুষ আছে শহরের কোথাও। দর্শক ভুলে গিয়েছিলো যে তারা একজন অভিনেতাকে দেখছে; তারা তাকিয়েছিলো এক আয়নার দিকে, যেখানে তাদেরই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছিলো। চঞ্চলের প্রেমিকা চরিত্রে নাবিলা তার অনাবিল সরলতায় ছবির প্রেমকে আলোকিত করেছিলেন। পার্থ বড়ুয়া কিংবা শতাব্দী ওয়াদুদ নিজেদের চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন শহরের অন্য মুখগুলো। সবাই মিলে তৈরি করেছিলেন এক জীবন্ত মানবমঞ্চ।
ঢাকার ভিজ্যুয়াল কবিতা ফুটে উঠেছিলো রাশেদ জামানের ক্যামেরায়। পুরান ঢাকার সরু গলি, রাতের অন্ধকার, দিনের ভিড়, অচেনা মানুষের ভিড় ঠাসা মুখ— সব একসাথে গেঁথে গিয়েছিলো পর্দায়। আলো-ছায়ার খেলা, অস্থির ক্যামেরা মুভমেন্ট, কিংবা স্থির দীর্ঘ শট— প্রতিটি ফ্রেমে ঢাকা শহর যেনো নতুন করে ধরা দিয়েছিলো। দর্শক ঢাকাকে এমনভাবে আগে কখনো দেখেনি।
অমিতাভ রেজার পরিচালনায় ফুটে উঠেছিলো অভিজ্ঞতার মুন্সীয়ানা। তিনি জানতেন কোথায় রহস্য বাড়াতে হবে, কোথায় থমকে দাঁড়াতে হবে, আর কোথায় দর্শকের বুকের ভেতর কাঁপন ধরাতে হবে। ‘আয়নাবাজি’র গল্প তাই কখনো থেমে যায়নি, কখনো স্থির হয়নি। প্রতিটি মুহূর্তে কাহিনি বদলে গেছে, চরিত্র বদলেছে, পরিচয় বদলেছে। আর দর্শক এক নিশ্বাসে ছুটে গেছে ছবির সঙ্গে। শুধু গল্প বা অভিনয়ই নয়, এর গানও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চিরকুটের গাওয়া ‘না বুঝি দুনিয়া’ গানটি এখনও দারুণ জনপ্রিয়।
পুরস্কারের ক্ষেত্রেও আয়নাবাজি দারুণ সফলতা পেয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মোট ৭টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে—শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক, শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা, শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক, শ্রেষ্ঠ পোশাক পরিকল্পক। দেশের বাইরে চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও দর্শক-সমালোচকের প্রশংসা কুড়িয়েছিলো।
কেন মানুষ আয়নাবাজিকে এত ভালোবেসেছিলো? কারণ, তারা নিজেদেরই খুঁজে পেয়েছিলো আয়নার ভেতর। আমরা সবাই প্রতিদিন অন্য কারো মুখোশ পরে বেঁচে থাকি— কর্মক্ষেত্রে এক রূপ, ঘরে আরেক রূপ, সমাজে তৃতীয় রূপ। আয়না সেই মুখোশখানি আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলো। দর্শক সিনেমা হলে বসে নিজের মুখই যেনো আয়নায় দেখতে পেয়েছিলো।


