বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে আবুল হায়াত এমন এক নাম, যিনি অভিনয়কে কখনো শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জীবনচর্চা হিসেবে। প্রকৌশলী হয়েও তিনি বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়ের পথ। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র মিলিয়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কাজ করছেন।
১৯৬৯ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় নির্মিত ‘ইডিপাস’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন ও মঞ্চে একসাথে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার অভিনয়জীবনের মাইলফলক হয়ে আছে।
ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ আবুল হায়াতের অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অভিনেতা হাসান ইমামের মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটক যখন বাংলাদেশে ছবিটির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তার সঙ্গে পরিচয়।
আবুল হায়াত ঋত্বিককে ‘আওলা’ বা কিছুটা খ্যাপাটে স্বভাবের পরিচালক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একবার শুটিংয়ের সময় চিত্রনাট্য হারিয়ে ফেলায় সহকারী পরিচালকের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের তুমুল ঝগড়াও হয়েছিল। কিন্তু আবুল হায়াতের পর্যবেক্ষণ ছিল একেবারেই আলাদা। তার ভাষায়, ‘লিখিত প্ল্যান না থাকলেও তিনি ছিলেন একজন অসম্ভব মেধাবী পরিচালক। সব কিছুই তার মাথার মধ্যে সাজানো থাকত। চিত্রনাট্য হারালেও তিনি নতুন করে সেটে বসে আবার লিখেছিলেন।’
আরিচা ঘাট ও বালিগাঁও এলাকায় হয়েছিল ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর শুটিং। সেই সময়ের যাতায়াত ছিল কষ্টসাধ্য। ভোর চারটা বা পাঁচটায় রওনা হয়ে ফেরি পার হয়ে লোকেশনে পৌঁছাতে হতো। ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা বেজে যেত। শুটিংয়ের প্রথম দুই দিন কোনো কাজ ছাড়াই বসে থাকতে হয়েছিল তাকে। তৃতীয় দিনে গিয়ে নেওয়া হয়েছিল তার প্রথম শট।
‘অয়োময়’-এর কাশেম, ‘আজ রবিবার’-এর মেজ ভাই, ‘বহুব্রীহি’-র খোকন সাহেব এবং হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি মিসির আলি তার সেরা কাজের তালিকায় রয়েছে। মঞ্চেও তিনি স্মরণ করেন ‘বাকি ইতিহাস’-এর সীতানাথ চক্রবর্তী এবং ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’-র মাখনের কথা। শেকসপিয়ারের ‘কিং লিয়ার’ চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছে তার এখনও অপূর্ণ।
অভিনয়ের পাশাপাশি অনেক টিভি নাটক পরিচালনা করেছেন। তবে এখনো কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়নি। অথচ সেই ইচ্ছা আজও বেঁচে আছে। সুযোগ পেলে তিনি নির্মাণ করতে চান একটি পারিবারিক গল্পের সিনেমা। তার ভাষায়, অলীক কোনো গল্প নয়, মানুষের ঘরের গল্পই বলে চাই।
বর্তমান সময়ের নাটক, চলচ্চিত্র এবং ওটিটি মাধ্যম নিয়েও তার ভাবনা স্পষ্ট। নতুন মাধ্যমকে তিনি স্বাগত জানান। তবে মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক, গল্পের শক্তি কমে গেলে দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলা যায় না। তার আক্ষেপ, প্রবীণ শিল্পীদের জন্য এখন আর জটিল চরিত্র লেখা হয় না। বেশির ভাগ সময় তাদের সহজ-সরল বাবার চরিত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেন, যাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নানা ধরনের চরিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।
এখন অভিনয়ে কিছুটা অনিয়মিত হলেও লেখালেখিতে সময় দিচ্ছেন বেশি। নতুন বই নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় পুরস্কার মনে করেন। আর তার সেই সহজ জীবনদর্শন আজও একই রকম অটুট— ‘চাইনি বেশি, তবু পেয়েছি অনেক।’


