জুলাই সনদ: কতদূর যাবে বিএনপি

জুলাই সনদ: কতদূর যাবে বিএনপি
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৈরি হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিতে দুই প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে জুলাই সনদের ওপর যে গণভোট হয়েছে, তার ফলাফল মানতে চাইছে না বিএনপি, বিরোধীদের দাবি অগ্রাহ্য করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনেও আগ্রহ দেখায়নি ক্ষমতাসীনরা।

ক্ষমতাসীন বিএনপি শেষ পর্যন্ত সনদের কোন কোন বিষয় কীভাবে বাস্তবায়ন করবে এবং এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।

যদিও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই বলে আসছেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই সনদের প্রতি বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি থেকে দল সরে আসছে না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে প্রধান উপদেষ্টার মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে এই সনদ সই হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপির পক্ষে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

সেদিন ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এই সনদে সই করেন, যদিও সনদে উল্লেখ থাকা নানা বিষয়ে বিএনপি আগেই আপত্তি জানিয়ে রেখেছিল।

এরপর জাতীয় নির্বাচনের দিন যে গণভোট হয়, তাতে ৬০ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে। নির্বাচনের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতারা গণভোট নিয়ে কথা বলেছেন কমই। দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেবল একটি প্রচারে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ‘না’ এর পক্ষে প্রচার চালানোর ভিডিও এসেছে সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে।

ভোটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছেন, ‘আমাদের একটা তাগাদা ছিল যে এরা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সেজন্য আমরা সব কিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। একত্রিত হয়েছি, সমঝোতা হয়েছে।’

তবে জুলাই সনদ বিএনপি মানে না–এমন কথাও বলা হয়নি একবারের জন্যও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই জুলাই সনদের মূল চেতনা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এবং জাতীয় ঐকমত্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘যেসব বিষয়ে আগে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়নি বা পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।’

সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে বিএনপির সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি অঙ্গীকার রয়েছে। এর অনেকগুলো জুলাই সনদেও আছে। সংসদের উচ্চকক্ষ তৈরি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফেরাসহ অনেকগুলো অঙ্গীকার করে ভোট চেয়েছে দলটি।

এরই মধ্যে জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। কিন্তু এতে জামায়াত ও তার জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি অংশ নেয়নি। তারা শেষ পর্যন্ত অংশ না নিলে একতরফা সংবিধান সংশোধন হয় কি না, এ নিয়েও আলোচনা আছে।

মির্জা ফখরুল টাইমসকে বলেন, ‘বিরোধী দল সহযোগিতা করলে সংস্কার দ্রুত হবে। কারণ, আলোচনার মাধ্যমেই সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব।’

সালাহউদ্দিন আহমদও একাধিকবার বলেছেন, জুলাই সনদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

দলীয় নেতারা জানান, সনদের বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে এখনও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে যেসব বিষয় সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন বা প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো বাস্তবায়নের আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং প্রয়োজনীয় আইনি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সনদের কিছু বিষয়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। আবার কিছু বিষয়ে সংসদীয় আলোচনা, সর্বদলীয় ঐকমত্য কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতামত প্রয়োজন হতে পারে।

ফলে বাস্তবায়নের গতি ও পদ্ধতি অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর। এ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে আগ্রহ ও উদ্বেগ রয়েছে।

নেতাদের ভাষ্য, জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে অনাগ্রহী নয় বিএনপি।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে প্রতিটি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে একটি বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনগণের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন বা দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন করার পাশাপাশি জুলাই সনদও বাস্তবায়ন করবে সরকার। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধনের জন্য আলোচনায় অংশ নিতে বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল আলোচনায় অংশ না নিয়ে বরং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চায়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad