চলতি বছরের ৬ এপ্রিল। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যে কুড়িগ্রাম শহরের সাহা ফিলিং স্টেশনে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলামের দুপুরের দিকে পরিদর্শনে আসার পর স্থানীয় এক সাংবাদকর্মী তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করতেই ক্ষেপে উঠেন।
‘ভাই কেন বললেন? সাধারণ মানুষ ভাববে আপনার সঙ্গে আমার স্বজনপ্রীতি রয়েছে। সবাই আমাকেও সাধারণ মানুষ ভাববে’, বলেন তিনি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নিয়ে সমালোচনা কত না। কর্মকর্তারা কি নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা ভাবেন? আরিফুল অন্তত ভাবেন।
বিশেষ করে বিসিএস পাস করে যারা চাকরিতে ঢোকেন তাদের অনেকের মধ্যে থাকে হামভরা ভাব। ‘স্যার’ বলে ডাকতে বাধ্য করার চেষ্টা নিয়ে মাঝেমধ্যেই অপ্রীতিকর ঘটনা সামনে এসেছে।
একসময় প্রশাসনের কর্মীদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেলেও পরে কৃষি কর্মকর্তা ও চিকিৎসা কর্মকর্তাদের মধ্যেও এমন মনোভাব দেখা যায়।
গত জুনে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন নুরুল ইসলামের সঙ্গে এক সাংবাদিকের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ছড়ায়, যাতে সেই সংবাদকর্মীর ‘ভাই’ সম্বোধনে আপত্তি জানান চিকিৎসক। বলেন, তাকে তাকে ‘মহোদয়’ বলতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘যদি জনগণকে সেবা দেওয়াটা মানদণ্ড হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের কোনো প্রভাব আমলাতন্ত্রে দেখা যাচ্ছে না। আমলাতন্ত্র সমসময়ই নিজেদেরকে প্রিভিলেজড ভাবে এবং সুবিধা সংরক্ষণ ও সুবিধামতো আরও সুসংহত করার কাজেই তাদের চেষ্টা ব্যয় হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে।’
তার পর্যবেক্ষণ বলছে, এই সময়ে আমলাতন্ত্র কেবল নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে। পদোন্নতি, পদায়ন, আর্থিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং সরকারের আর্থিক চাপের মধ্যেও নতুন বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে চাপ দিয়েছে। অথচ আমলাতন্ত্র কখনও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, ‘গত দুই বছরের আমলাতন্ত্র আগের চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে। আমলাদের উচ্চাভিলাষ, হিংসা-বিদ্বেষ-সংকীর্ণতায় সরকার বিভ্রান্ত হচ্ছে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।’
গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোও শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। আমলাতন্ত্র সংস্কার, মেধা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ বদলির কথা বলেছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেখান পিছু হটার লক্ষণ স্পষ্ট। আর অবসরে যাওয়া একদল কর্মকর্তাকে চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনে বরং তৈরি করেছে নতুন সংকট।
আওয়ামী লীগ শাসনামলেও রংপুরের ডিসি চিত্রলেখা নাজনীনকে স্যার না বলায় তিনি ক্ষুব্ধ আচরণ করেন বলে অভিযোগ আনেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক। এই ঘটনার প্রতিবাদে সে সয়ম ওমর ফারুক অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে চিত্রলেখা নাজনীন দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু তাতেও আলোচনা থামে না।
অথচ সরকারি সেবা নিতে আসা জনসাধারণকে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতে হবে, এমন কোনো নীতি নেই।
আমলাদের সুযোগ সুবিধা কমানোর চেষ্টা ব্যর্থ
কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেক করার সিদ্ধান্ত নিয়েও সরে আসতে বাধ্য হয়েছে সরকার। গত ৯ জুলাই অর্থ বিভাগ সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলে জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে। সেই আলোকে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায় যে, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমালে প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অথচ খরচ কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশ বাহিনীর জনবল ও যানবাহনের সংকট মোকাবিলায় ১৮ জন মন্ত্রীর পুলিশ পাহারার সুবিধা বাতিল করতে পেরেছে। সরকারের মন্ত্রীরা তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ছাড় দিলেও আমলারা তা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে অটল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলছেন, ‘এখনো যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে আমলাদের ক্ষমতা বেশি। কারণ, সরকার সিদ্ধান্ত দিল আমলাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমাবে। কিন্তু সরকারকে আগের সিদ্ধান্তে ফেরাতে বাধ্য করেছে তারা। তার মানে হচ্ছে আমলারা সরকারের চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখে।’
সরকার আর্থিক চাপে থাকলেও সরকারি কর্মকর্তারা বেতন ভাতা বাড়ানোর জন্য মুহাম্মদ ইউনূসের নেতেৃত্বে অর্ন্তবর্তী সরকার সময় থেকেই চাপ সৃষ্টি করে। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বেতন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েও পরে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের কাজ শুরু হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ও আমলাতন্ত্রের অতি ক্ষমতাবান হয়ে উঠার বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন কয়েকজন সদস্য। তারা বলেন, রাষ্ট্রের কর্মচারীরা জনপ্রতিনিধদের কথা শোনে না, গুরুত্ব দেয় না।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই কমিশন মেধাভিত্তিক নিয়োগ-পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর গড়ার সুপারিশ করে। তবে, তার কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি, হয়নি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের রোডম্যাপও।
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আওয়াল মজুমদার টাইমসকে বলেন, আমলাদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে প্রশাসনে আরও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি ও পদোন্নতি চায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আমলে যেসব কর্মকর্তাদের বিএনপির তকমা দিয়ে বঞ্চিত করা হয়েছিল তারা ঘুরছেন চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছে।’
‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে আমি বলেছিলাম অর্থনৈতিক সংকট সরকার মোকাবেলা করতে পারবে। কিন্তু আমলাতন্ত্রকে গোছানো হবে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটা নিয়ে সরকার বেশি বিপদে পড়বে। তা-ই হয়েছে’, বলেন তিনি।


