ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত দিয়ে ‘পুশইন’-এর জোয়ার ঠেকাতে চার গুণ বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ শত শত বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুরুতে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে কয়েক শ’ মানুষকে জড়ো করে গণ পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখানে ব্যর্থ হওয়ার পর বিএসএফ এখন অন্যান্য সীমান্ত এলাকা দিয়ে এই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এর জবাবে বিজিবি সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, বিএসএফ নিয়মিতভাবে পুশইনের চেষ্টা করলেও বিজিবি তা নস্যাৎ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সীমান্ত টহল চারগুণ বাড়ানো হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই কাউকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
মে মাসের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এর পর পরই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএইএ) বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে এই সীমান্ত সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আটক করে সরাসরি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করবে। এই সন্দেহভাজনদের ‘অনিবন্ধিত’ হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত আটক কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে।
গত ২৯ মে পাওয়া খবরে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এক অভিযানে অন্তত ৩৮৬ জন নথিবিহীন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এরপর তাদেরকে আটটি সীমান্ত জেলাজুড়ে থাকা ১৩টি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, এই মানুষগুলো স্বেচ্ছায় সীমান্তে জড়ো হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার কেরাগাছি ও চন্দনপুর সীমান্তে গত ২৬ মে থেকে ভারতের হাকিমপুর এলাকা থেকে পুশইনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সীমান্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিজিবির তীব্র প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ হাকিমপুর আটক কেন্দ্র থেকে বাংলাভাষীদের সরিয়ে অন্য সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
সাতক্ষীরার ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান জানান, তার অধীনস্থ ৫৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টগুলোতে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে বিজিবি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ সীমান্তেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ভারতের আশরাফপুর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বাংগাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬টি শিশুসহ মোট ২৮ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে।
এই এলাকাটি নওগাঁর ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই ২৮ জন ব্যক্তিকে ভারতীয় ভূখণ্ডের জিরো লাইনে আটকে দিয়েছি। তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের জোরপূর্বক পুশইন সহ্য করা হবে না। আমরা বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি, একইসঙ্গে আমাদের সীমান্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করেছি।’
এদিকে, নীলফামারী ও পঞ্চগড় সীমান্তেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বুধবার দিনভর সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোতে মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ রোধ এবং সম্ভাব্য পুশইনের হুমকি নিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধি, কমিউনিটি নেতা ও বাসিন্দাদের সঙ্গে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে।
৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলার ১৯টি সীমান্ত চৌকি বা বিওপি ক্যাম্পে জনবল বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা দিনরাত তাদের নিজ নিজ এলাকায় টহল দিচ্ছেন। রাতে সার্চলাইট, ফ্ল্যাশলাইট এবং নাইট-ভিশন গগলস ব্যবহার করে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ
বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ১০টি পৃথক পুশইনের চেষ্টা নস্যাৎ করেছে বিজিবি।
ঝিনাইদহে বিএসএফ যাদবপুর সীমান্ত দিয়ে ৪ থেকে ৫ জন এবং মহেশপুর সেক্টর দিয়ে আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে। তবে বিজিবির টহল দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ সদস্যরা তাদের আবার ভ্যানে তুলে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
একই ধরনের পুশইনের চেষ্টা যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত দিয়েও ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিজিবির খুলনা ব্যাটালিয়ন সফলভাবে এই অপচেষ্টা প্রতিহত করে। এ ছাড়া আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জয়পুরহাটের কায়া ও বাসুদেবপুর সীমান্ত দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টার সময় ১০ জনকে আটকে দেয় ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়ন।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অনেক মানুষকে অস্থায়ী কেন্দ্রে আটকে রেখেছে এবং যেকোনো সময় তাদের পুশইন করা হতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিএসএফ ক্যাম্পের কাছে চারজন মুসলিম নাগরিককে আটকে রাখার খবর রয়েছে। পাশাপাশি সোনামসজিদ সীমান্তের ঠিক বিপরীতে ভারতের মালদা জেলার একটি আটক কেন্দ্রের ২২ জনকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তের কাছে বিএসএফের কাঁকরমনি ক্যাম্পের একটি টহল দল দুজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে হেফাজতে রেখেছে বলে খবর পেয়েছে বিজিবি। পঞ্চগড়ে রওশনপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা এক ব্যক্তিকে স্থানীয় বাসিন্দারা আটক করে এবং পরে বিজিবি তাকে ভারতে ফেরত পাঠায়। সিলেটের উতমাছড়া সীমান্তেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে, যেখানে স্থানীয়রা দুজনকে ধরে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। বিজিবি তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার পর জিরো লাইনের ওপারে ফেরত পাঠায়।
নেত্রকোনার কাঁটাতারহীন কচুগাড়ী সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে ১৫ থেকে ২০ জনকে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করা হয়েছে এমন খবরের পর সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে বিজিবি।
বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো অবস্থাতেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি লঙ্ঘন করে এমন যেকোনো পুশইনের চেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করা হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।


