সব মামলায় জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি পাননি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।
তাদের মধ্যে আইভীর মুক্তি না পাওয়ার কারণটি বেশ চমকপ্রদ। আপিল বিভাগ তার ১০ মামলায় জামিন বহাল রাখার আদেশ দিলেও লিখিত আদেশে সকল বিচারপতির সাক্ষর হয়নি। একজন বিচারপতি বিদেশে থাকায় আপিল বিভাগের লিখিত আদেশে তিনি সাক্ষর করতে পারেননি। তাই জামিন পেয়েও ১৫দিন ধরে কারাগারে আছেন আইভী।
অন্যদিকে আগের সব মামলায় জামিনের পর কারামুক্তির আগেই নতুন মামলায় ‘গ্রেপ্তার হয়েছেন’ সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ বলেন, জামিন পাওয়ার পর কোনো ব্যক্তিকে আবার নতুন মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। একজন মানুষ যে অপরাধ করেছেন, তার জন্য তাকে গ্রেপ্তার ও বিচার করা উচিত। কিন্তু তাকে যদি সম্পর্কহীন অন্য মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের বিশ্বাস নষ্ট হয়।
গত বছরের ৯ মে নারায়ণগঞ্জের বাসভবন থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে তিনটি হত্যা এবং দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নিম্ন আদালত এই পাঁচ মামলায় জামিন নামঞ্জুর করলে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন এবং হাইকোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করেন।
পরবর্তীতে ফতুল্লা থানার চারটি হত্যা মামলা এবং নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগে করা আরও একটি মামলাসহ মোট পাঁচটি মামলায় তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এই দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় ও রুল জারি করে। রাষ্ট্রপক্ষ এই ১০টি মামলার জামিন স্থগিত করার আবেদন করলেও গত ১০ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের জামিনের আদেশই বহাল রাখে।
আগের মামলাগুলোয় জামিন পাওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা আরও দুটি হত্যা মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য পুলিশ আদালতে নতুন আবেদন করে। এর মধ্যে প্রথম আবেদনটি ২ মার্চ এবং দ্বিতীয়টি ১২ এপ্রিল জমা দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এই দুটি আবেদনই মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট এই দুই মামলায় আইভীকে জামিন দেয়, যা ১৭ মে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে।
আইভীর আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু জানান, সরকার জামিনের এই আদেশগুলো সম্পর্কে অবগত আছে এবং গণমাধ্যমেও তা প্রকাশিত হয়েছে। তারা প্রতিটি মামলায় জামিননামা জমা দিয়েছেন। তাই স্বাক্ষরিত লিখিত কপির জন্য অপেক্ষা না করে বর্তমান আদেশের ভিত্তিতেই কর্তৃপক্ষ আইভীকে মুক্তি দিতে পারত।
এদিকে গত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট দুটি হত্যা মামলায় গত ১২ মে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ২০ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশটি বহাল রাখে।
খায়রুল হকের আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন গত ১৩ মে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। সেখানে সুনির্দিষ্ট অপরাধের বাইরে অন্য কোনো নতুন মামলায় তাকে যেন গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করা হয়, সেই নির্দেশনা চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৭ মে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যে, নির্দিষ্ট মামলাগুলো ছাড়া অন্য কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো বা হয়রানি করা যাবে না।
তবে এই নির্দেশনার আগের দিনই যাত্রাবাড়ী থানায় জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক খোবাইব হত্যা মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য পুলিশ একটি আবেদন জমা দেয়। গত ২৩ মে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক সেই আবেদন মঞ্জুর করে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
খায়রুল হকের আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন বলেন, এই নতুন মামলার কারণে তার মুক্তি আটকে গেছে। এখন কারামুক্ত হতে হলে তাকে এই নতুন মামলাটিতেও জামিন নিতে হবে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট আটটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার হত্যা মামলা, রাজউকের প্লট কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায় নিয়ে দায়ের করা মামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া জুলাইয়ের আন্দোলনের ঘটনায় যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানায় করা আরও দুটি হত্যা মামলায়ও তিনি আসামি।
গত বছরের ২৪ জুলাই ঢাকার ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে পুলিশ তাকে প্রথম গ্রেপ্তার করে। পরে যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।


