ঢালিউডের সোনালী সময় সত্তর-আশি দশকে যে কজন শিল্পী নিজেদের একাধিক পরিচয়ে পরিচিত করিয়েছেন তাদের মধ্যে জাভেদ অন্যতম। চিত্রনায়ক, নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক— এ তিন ভূমিকায় তিনি ছিলেন সমান সফল। এ কিংবদন্তি শিল্পী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে মারা গিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ক্যানসারের ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ ।
খবরটি নিশ্চিত করে তার স্ত্রী ও চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরী জানান, জাভেদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কিছুদিন আগে হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় আনা হয়। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। বুধবার সকালে নার্সরা এসে জানান, তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। পরে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বুধবার বাদ আসর এফডিসিতে জানাজা শেষে তাকে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর বড় মসজিদের পাশের মসজিদ তাকে দাফন করা হয়েছে।
জাভেদের আসল নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পরিবারসহ পাঞ্জাবে চলে যান। চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু নায়ক হিসেবে নয়, ষাটের দশকে কায়সার পাশা পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘মালান’-এ নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে।
১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু চলচ্চিত্র ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে অভিনয় শুরু করেন জাভেদ। এরপর প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন বাংলা সিনেমার মূলধারার একজন নিয়মিত ও জনপ্রিয় নায়ক।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মালকা বানু’, ‘নিশান’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘আজো ভুলিনি’, ‘চোরের রাজা’ ও ‘জালিম রাজকন্যা’। বিশেষ করে ‘নিশান’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত হয়।
জাভেদের ক্যারিয়ারে মাইলফলক ছিল ১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মালকা বানু’। শাবানার বিপরীতে মনু মিয়ার চরিত্রে তার অভিনয় এবং ছবির গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘মালকা বানুর দেশেরে বিয়ার বাদ্য বাজেরে…’ গানটি সত্তর ও আশির দশকে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে নির্মিত হয় ‘রঙিন মালকা বানু’, যা ব্যবসাসফল হয়।
বাংলা সিনেমার নাচে জাভেদের অবদান অনন্য। মুম্বাইয়ে গিয়ে কিংবদন্তি নৃত্যগুরু সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে তালিম নেন। তার সহপাঠী ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার প্রয়াত সরোজ খান। শেষে দেশে ফিরে অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালনায় মনোযোগ দেন। শাবানা, ববিতা, কবরী, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষসহ অসংখ্য নায়িকা তার নির্দেশনায় নাচে দর্শক মাতিয়েছেন।
নায়ক আলমগীর ও তিনি নিজেদের দুধভাই হিসেবে পরিচয় দিতেন। একাধিক সাক্ষাৎকারে জাভেদ বলেছেন, জীবনের প্রতিটি সংকটে আলমগীরকে তিনি পাশে পেয়েছেন। আলমগীরের স্ত্রী, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার সঙ্গেও ছিল তার সুসম্পর্ক।
পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন জাভেদ। এলাকাবাসীর ভালোবাসায় সেই মহল্লার নাম হয়ে যায় ‘জাভেদ মহল্লা’। তিনি নিজেও বলেছিলেন, ওই এলাকার স্মৃতি তার জীবনের অমূল্য অংশ। জীবনের শেষভাগে তিনি উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন।
জাভেদের শেষ জীবনে তিনি সিনেমা হলে বসে দেখেছিলেন ‘মা বাবা সন্তান’। ২০১৫ সালে টঙ্গীর একটি সিনেমা হলে ছবিটি দেখতে গিয়ে অল্প দর্শক দেখে তিনি গভীর হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। এক সময়ের দর্শকসমুদ্রের কথা স্মরণ করে তার সেই আক্ষেপ আজ বাংলা সিনেমার বাস্তবতার এক নীরব দলিল হয়ে আছে।


