দীর্ঘ ৯৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বাড়ি ফিরলেন নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত (১৩)। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ১৩ তলার ১৩৬৫ নম্বর কেবিনের দরজা খুলে যখন দীপ্তকে হুইলচেয়ারে করে বের করা হলো, করিডোরজুড়ে সবার চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত আনন্দ। স্বজনদের চোখে আনন্দের অশ্রু আর চিকিৎসকদের মুখে স্বস্তির ছাপ।
ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোল স্কুলে বিমান আছড়ে পড়ার পর পেরিয়েছে অনেকটা সময়। সেই দুর্ঘটনায় দগ্ধ দীপ্ত টানা তিন মাস লড়েছে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে। কবে সে সুস্থ হয়ে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কিনা তা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা।
১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থেকে, ৩৬ বার অপারেশনের টেবিলের ছুরি-কাঁচি পেরিয়ে সেই দীপ্ত যখন সোমবার বাড়ি ফিরছেন তখন শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও তার চোখে অদম্য সাহসের ছাপ। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আরও দৃঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সেই লড়াইয়ের গল্প। পাশেই ছিলেন দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান বিপ্লব, মা নুরুন নাহার এবং ছোট বোন নাইরা। লড়াই তারাও কম করেননি।
ফেরার আনন্দের মধ্যেও দীপ্তর ভেতরে এখনও স্মৃতির ভার। সেই অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছে প্রিয় দুই বন্ধু আয়ান ও মাকিনকে। গত ২১ জুলাই দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় গুরুতর আহত হয় দীপ্ত। পুড়ে যায় শরীরের ৪৫ শতাংশ। বন্ধুপ্রিয় ও সাহসী দীপ্ত সেদিনও বন্ধুদের পিছনে ফেলে একা বের হতে পারেনি, চেয়েছিল বন্ধুদের বাচাঁতে। তাদের নিয়ে ফেরার সাহস দেখিয়েছে সে নিজের জীবন বাজি রেখে।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় বাবা মিজানুর রহমান বিপ্লবের চোখে আনন্দাশ্রু। আবেগ আটকাতে না পেরে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা শুধু আল্লাহকে বলেছি, আমাদের ছেলেটা যেন বেঁচে ঘরে ফিরে। আজ ছেলে আমাদের সাথে ঘরে ফিরবে। এর চেয়ে বড় সুখ আমাদের জীবনে আর নেই।’
দোয়া মাঝে মাঝে অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেয়, এমনটাই মনে করেন এই বাবা। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার-নার্স আর সারা দেশের মানুষের দোয়া ছাড়া আজকের দিনটা আমরা পেতাম না।’
প্রথমদিন থেকেই দীপ্তর লড়াইটা ছিল কঠিন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘তিনবার এমন পরিস্থিতি হয়েছে, আমরা ভেবেছি দীপ্তকে আর বাঁচানো যাবে না। দু’বার তার পরিবারকে নেগেটিভ কাউন্সেলিং করতে হয়েছে। সেটা অন্য কারও ক্ষেত্রে হয়নি।’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নেগেটিভ কাউন্সেলিং বলতে বোঝায় রোগীর আর বাঁচার সম্ভাবনা না থাকায় তার আগ মুহূর্তে পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।
মারুফুল ইসলাম কথা বলেন দীপ্তর কঠিন চিকিৎসাকাল নিয়ে। তিনি বলেন, ‘দীপ্তকে মোট ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকতে হয়েছে এবং আইসিইউতে ছিল ২২ দিন। এরপর হাসপাতালের বিশেষ বিভাগ বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ৩৫ দিন এবং কেবিনে ৪০ দিন কাটিয়েছে সে।’
দীপ্তর মোট ৩৬ বার ছোট-বড় অপারেশন হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ বার এক্সিশন এবং শরীরের ক্ষতস্থানে চামড়া প্রতিস্থাপন হয়েছে আট বার। আগুনে দগ্ধ আর কোনো রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়া এত জটিল হয়নি বলে জানিয়েছেন যুগ্ম পরিচালক। তার মতে, ‘দীপ্তর শারীরিক ও মানসিক শক্তিই তাকে ফিরিয়ে এনেছে আমাদের মাঝে। এটা সত্যিই মিরাকল ছাড়া আর কিছু না।’
দুর্ঘটনার রাতে দীপ্তর জীবন এক মুহূর্তে বদলে যায়। আগুনে দগ্ধ হয়ে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করলেও প্রথম দিন থেকেই তার বাঁচার ইচ্ছা ছিল প্রবল। ঠিক এই জায়গাটাই তাকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দীপ্ত প্রথম দিনেই আমাকে বলে স্যার, আমি বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচান। এই কথাটাই আমাদের পুরো টিমকে শক্তি দিয়েছে।’
দীপ্তের ফুসফুসের ভেতর পানি জমে অবস্থা ছিলো সংকটাপন্ন। চিকিৎসা পরিভাষায় একে এআরডিএস বলা হয়। এই রোগে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম, আর শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। দীপ্তকে এই পরিস্থিতিতে উল্টে শোয়ানো অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেটা ছিলো অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সেই ঝুঁকি নিয়েছি এবং আল্লাহর রহমতে তা সফল হয়েছে।’
দীপ্তর চিকিৎসায় ছিল বহু ধাপ। সংক্রমণ প্রতিরোধ, ফুসফুস স্বাভাবিক করা, শ্বাস-প্রশ্বাস স্থিতিশীল রাখা, দগ্ধ জায়গার সার্জারি আরো অনেক কিছু। সব ধাপই চ্যালেঞ্জিং। চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও। যৌথ সিদ্ধান্তেই দীপ্তকে বিদেশ না পাঠিয়ে দেশেই চিকিৎসা চালানো হয়।
দীর্ঘ কঠোর সময় পেরিয়ে এখন স্বস্তিতে তার পরিবার। নিরাশার মাঝে থেকেও দীপ্তকে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মা নুরুন নাহার। ঘরে ফেরার দিনে ছেলের আবার স্কুলে ফেরার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আগের স্মৃতি ভুলে স্কুলে যাওয়াটা ওর জন্য কষ্টসাধ্য হবে, তবে আমার ছেলে অনেক সাহসী। সে অবশ্যই যাবে।’


